নিজস্ব প্রতিবেদক: বীমা পলিসির শর্ত অনুসারে পপুলার রাইজিং বা গণঅভ্যুত্থানের কারণে সংঘটিত ক্ষতি বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না এবং এ ধরণের ক্ষয়ক্ষতির কোন বীমা দাবি পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার পাশাপাশি বীমা দাবি পরিশোধে ‘গণঅভ্যুত্থান’কে বিবেচনা না করার নির্দেশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
পলিসির শর্ত অনুসারে বীমা দাবি পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় দেশের একমাত্র পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান এসবিসি। রাষ্ট্রায়ত্ব পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)’কে গত ৪ জানুয়ারি এমন নির্দেশ দিয়েছে বীমা খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
গেল বছরের ৩ মার্চ বেসরকারী বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন জরিপ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে অনুষ্ঠিত সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)’র একটি বৈঠকে ‘পপুলার রাইজিং’ এর দ্বারা সংঘটিত ক্ষতি বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না বলে একমত পোষণ করেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা পলিসির শর্ত অনুসারে ‘গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি’ বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে; স্বাক্ষরিত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫। ফলে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতিকে ‘গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা না করার নির্দেশ- এক প্রকার গণঅভ্যুত্থানকেই অস্বীকার করার সামিল।
তাদের মতে, সরকারের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার লিখিত এমন নির্দেশনা গণঅভ্যুত্থান অস্বীকার করার আইনগত ভিত্তি তৈরি করবে।
অপরদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র এমন নির্দেশনাকে কাজে লাগিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির বিপরীতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বেআইনীভাবে বীমা দাবি আদায়ের সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন তারা।
এ ছাড়াও বীমা কর্পোরেশন আইন, ২০১৯ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সাধারণ বীমা করপোরেশন একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। সেক্ষেত্রে সংবিধিবদ্ধ একটি সংস্থার নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেয়ার এখতিয়ার আইডিআরএ’র রয়েছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক বীমা পলিসি ও ফায়ার ইন্স্যুরেন্স পলিসির শর্ত অনুসারে- গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না।
গেল বছরের ৩ মার্চ বেসরকারী বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন জরিপ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে অনুষ্ঠিত সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)’র একটি বৈঠকে ‘পপুলার রাইজিং’ এর দ্বারা সংঘটিত ক্ষতি বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না বলে একমত পোষণ করেন।
তবে ‘গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত বীমা দাবি কোন প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা হবে- তার কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি ওই সভায়। সভায় মতামত দেয়া হয় পলিসির শর্ত অনুসারে বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে বীমা দাবি পরিশোধের সুযোগ নেই।
সভার পর্যালোচনায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে তা ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট বা তৎপরবর্তী সময়ের ঘঠনাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মতামত দেয়া হয়।
এসবিসি’র এই নীতিগত সিদ্ধান্ত সকল বীমা কোম্পানিকে পাঠানো হয় গত ২৩ মার্চ। এসবিসি’র সভার পর্যালোচনায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন ও বীমা পলিসির শর্ত অনুসারে- বীমাকৃত সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ‘প্রক্সিমেট কজ’ বা নিকটতম কারণ ‘গণঅভ্যুত্থান’ হলে তা বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না। একইসাথে স্ট্যান্ডার্ড ফায়ার পলিসির ৬(ডি) নম্বর শর্তানুসারে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অল রিস্ক (আইএআর) বীমা পলিসিতেও গণঅভ্যুত্থান বীমার আওতায় পড়ে না।
এ ছাড়াও এনডোর্সমেন্ট এর স্পেশাল কন্ডিশন ৬(বি)’র শর্তানুসারেও গণঅভ্যুত্থান (পপুলার রাইজিং) বীমা কভারেজের আওতায় পড়ে না। এমনকি পলিসিতে রায়ট এন্ড স্ট্রাইক এর ঝুঁকি নেয়া থাকলেও সেটি গণঅভ্যুত্থান কভার করে না।
এদিকে সাধারণ বীমা করপোরেশনের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। সংস্থাটি গত ৪ জানুয়ারি এসবিসিকে এই চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, গত ১৭ ডিসেম্বর আইডিআরএ’ কার্যালয়ে স্টেকহোল্ডারদের সাথে ‘পপুলার রাইজিং’ কে কারণ উল্লেখপূর্বক বীমা/পুনর্বীমা দাবি নাকোচ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ওই সভার বরাত দিয়ে আইডিআরএ’র চিঠিতে বলা হয়- সাধারণ বীমা করপারেশন তাদের ৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিবে। সেই সাথে সকল নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান সকল বীমা দাবি ‘পপুলার রাইজিং’ হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিটি বীমা দাবির বিপরীতে বীমা আইন ও বিধি মোতাবেক সার্ভেয়ার নিয়োগ দিবে এবং সার্ভে রিপোর্ট এর ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয় আইডিআরএ’র চিঠিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এটা যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি গণ-অভ্যুত্থানে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। গণমাধ্যমে জুলাই-গণঅভ্যত্থানের সময় হিসেবে বেশি আলোচিত ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগষ্ট।
তবে আইডিআরএ নির্দেশনায় এই সময়কেও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। বরং সকল বীমা দাবিকে পপুলার রাইজিং হিসেবে বিবেচনা না করা সিদ্ধান্ত দিয়েছে। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিকে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা না করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে করে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো সম্পত্তির বিপরীতে বীমা দাবি উত্থাপিত হলে তা নিষ্পত্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে।
Leave a Reply