নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজার থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে এই আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ ব্যয় করা হবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে।
দীর্ঘ বিরতির পর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে নতুন কোম্পানির বাজারে আসার উদ্যোগকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মূল্যায়ন জরুরি।
কোম্পানিটির প্রস্তাবিত আইপিও সামনে রেখে ১৮ অক্টোবর যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য রোড শো আয়োজনের কথা রয়েছে। রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কোম্পানির আর্থিক অবস্থান, ব্যবসা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা এবং প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে কোম্পানির আয়, সম্পদ, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ মুনাফার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা-
কনফিডেন্স গ্রুপের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হবে। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও বাগেরহাটে ১০০ মেগাওয়াট করে দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বাগেরহাটের মোংলা এলাকায় প্রকল্পটি ডরিন পাওয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ফটিকছড়িতে আরও ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজেসের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কোম্পানিটির উপস্থিতি বাড়বে।
প্রস্তাবিত ৪০০ কোটি টাকার আইপিওর অর্থের মধ্যে ২৩০ কোটি টাকা চট্টগ্রামের ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি কেনা ও নির্মাণকাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। মোংলার প্রকল্পে ইকুইটি বিনিয়োগ হিসেবে ব্যয় হবে ১০২ কোটি টাকা। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণের একটি অংশ পরিশোধে ৬০ কোটি টাকা এবং আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ে ৮ কোটি টাকা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
আয় কমলেও মুনাফা ধরে রেখেছে কোম্পানি
কোম্পানিটির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে আয় ছিল ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
তবে আয় কমলেও কোম্পানিটির নিট মুনাফায় বড় ধরনের পতন হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৪৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ মুনাফা ছিল ৪৮৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয় কমলেও মুনাফা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৬ সালের জুন শেষে কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ৮১৮ কোটি টাকা। কোম্পানিটির সংরক্ষিত মুনাফা বা রিটেইনড আর্নিংস রয়েছে ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।
বিনিয়োগকারীদের জন্য যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-
কনফিডেন্স পাওয়ারের আইপিওর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং নতুন প্রকল্পগুলো কতটা দ্রুত উৎপাদনে আসবে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। জমি অধিগ্রহণ, নির্মাণকাজ, অর্থায়নের ব্যয় এবং বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি—সবকিছুই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ মুনাফায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া কোম্পানিটির আয় কমে যাওয়ার কারণ, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আয় ও মুনাফার স্থায়িত্ব, ব্যাংকঋণের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নতুন প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় অর্জিত না হলে কোম্পানির আর্থিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হতে পারে।
কোম্পানিটির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বার্ষিক আয় বেড়ে ৩ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ৯৭৬ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। তবে এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রক্ষেপণ; বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিদ্যুতের চাহিদা এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর।
সব মিলিয়ে, কনফিডেন্স পাওয়ারের আইপিও পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে শেয়ারের ইস্যুমূল্য, কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, ঋণের দায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকি যাচাই করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য লাভের নিশ্চয়তা নয়।
Leave a Reply