নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারই অংশ হিসেবে দেশের জ্বালানি তেল বিপণনের তিন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান—পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি একীভূত করে দুটি কোম্পানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তেল আমদানির একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন থাকা মোট আটটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়ে বিপিসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিপিসি ও তার অধীন কোম্পানিগুলোর বিদ্যমান জনবল কাঠামো কার্যভার অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কোনো পদ সৃষ্টি না করা ও বিদ্যমান পদ বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিপিসি এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এই উদ্যোগ হঠাৎ নেওয়া হয়নি। বিপিসি ও তার অধীন কোম্পানিগুলোর জনবল, কর্মপরিধি ও সাংগঠনিক কাঠামো যৌক্তিকীকরণের লক্ষ্যে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সংস্কারসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ১০ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পাঁচটি সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। এরপর ১৫ জানুয়ারি সুপারিশসহ চিঠিটি বিপিসির কার্যালয়ে পৌঁছেছে। মূলত প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা ও কার্যকারিতা বাড়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বিপিসি সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি পেট্রোলিয়াম জ্বালানি খাতের সংস্কার শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী দেশে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আট প্রতিষ্ঠানকে কমিয়ে পাঁচটিতে নামানো হচ্ছে।
ওই চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী- বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বিদ্যমান সিস্টেম একীভূত করে বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোকে ডাউনসাইজ করতে হবে। বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোতে নতুন কোনো পদ সৃষ্টি কিংবা বিদ্যমান কোনো পদ বিলুপ্ত করা যাবে না, এছাড়া কোনো পদ উন্নীত করা যাবে না। বিপিসির আওতাধীন বিদ্যমান আটটি কোম্পানিকে কাজের ধরন অনুযায়ী পাঁচটি কোম্পানিতে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
বিপিসির নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব সম্পূর্ণ মালিকানা ও অংশীদারত্বে আটটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- শতভাগ মালিকানার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল), এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল), ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স পিএলসি (ইএলবিএল), পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসি (পিটিসিপিএলসি), যৌথ অংশীদারে পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিএলসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড এবং ৫০ শতাংশের অংশীদারি প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল)।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইএলবিএল ও এসএওসিএলের বেসরকারি খাতের ৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে কোম্পানি দুটিকে ইআরএলের সঙ্গে একীভূত করতে হবে। পাশাপাশি তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনাকে একীভূত করে দুটি কোম্পানি গঠন করতে হবে।
সুপারিশ অনুযায়ী, বিপিসির দুই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম একীভূত হয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা যায়।
বিপিসি ও অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। একীভূত হওয়ার বিষয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিপিসির প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপারেশনাল লাভের চেয়ে নন-অপারেশনাল খাতের আয়ের মাধ্যমে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা লাভ করছে। শ্রম আইনের দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারি টাকায় ব্যাংকে স্থায়ী আমানত রেখে তা থেকে আয়ের টাকা ভাগাভাগি করা হচ্ছে।
ইআরএল শতভাগ রিফাইনারি, ইএলবিএল ও এসএওসিএল ব্লেন্ডিং প্ল্যান্টনির্ভর কোম্পানি হলেও ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে কোনো নিয়ম-নীতিমালা না মেনে বিপণন প্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছে। এখন সংস্কার কমিশন বিষয়টিগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। ইএলবিএল ও এসএওসিএল ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে একীভূত হলে প্রতিষ্ঠান দুটির জনবলের চাকরির নিশ্চয়তা ও সুবিধা বাড়বে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ও কমে আসবে।’
Leave a Reply