নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। কোথাও অনুমোদিত লোড অনুযায়ী গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন নেমেছে মোট সক্ষমতার সর্বনিম্নে। চলমান গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কারখানার বিভিন্ন মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিল্প মালিকদের আর্থিক ক্ষতি।
কারখানাগুলোতে অনুমোদিত লোড অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের মানও নষ্ট হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে দিনের পর দিন উৎপাদন কমলেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কাটছে না সংকট।
শঙ্কার বিষয় হলো, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এরই মধ্যে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ শিফট কমিয়ে দিয়েছে, আবার কোথাও মেশিন ও উৎপাদন লাইন দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাস সংকটের বিষয়ে বারবার সরকার ও সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণ কোম্পানিকে অবহিত করা হয়েছে। চিঠি দিয়ে সমস্যার কথা জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সংকট সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে বাধ্য হয়েই ক্ষতি মেনে নিয়ে কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন।
এদিকে জ্বলছে না চুলা, সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন: আবাসিক গ্রাহকরাও গ্যাস সংকটে তীব্র ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে অনেক বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। ফলে রান্না করতে না পেরে অনেক পরিবারকে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, হিটার বা এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বাড়তি খরচের বোঝাও চাপছে সাধারণ মানুষের ওপর।
তিতাস বলছে, তিতাস এখন ১২শ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাচ্ছে। আমাদের চাহিদা ১৯শ মিলিয়ন ঘনফুট। এফএসআরইউ ঠিক হলেই সংকট কেটে যাবে বিষয়টি এমন নয়। এফএসআরইউ নষ্ট হওয়ার আগে আমাদের দেওয়া হচ্ছিল ১৫শ মিলিয়ন ঘনফুট।
রূপগঞ্জ অনন্ত কমপ্লেক্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদুল হক সেলিম বিজনেস প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের চারটা ইউনিটের মধ্যে মাত্র দুইটা ইউনিট কোন রকম চলছে তাও গ্যাসের চাপ ঠিক মতো পাচ্ছি না। বিগত ১৫-১৬ দিন এই সংকট চলছে যার ফলে আমাদের ৭০ শতাংশ প্রোডাকশন কমে গেছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই)চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বিজনেস প্রতিদিনকে বলেন, গ্যাসের সমস্যা সমাধান হচ্ছেই না। সরকার কিভাবে শিল্পখাতকে সুরক্ষা দিবে তার সমাধান বের করা জরুরি হয়ে গেছে। গ্যাসের কারণে যেসবা ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের ঋণের বোঝা না বাড়াইয়া সরকারের উচিত দায়িত্ব নেওয়া।
তিনি বলেন, সরকার গ্যাসের সম্ভাবনা দেখিয়ে উৎপাদনমুখি কোম্পানিগুলোকে এনেছে। কোন ফ্যাক্টরি বন্ধ করে সুরক্ষা হয় না তাই একটা পলিসি বের করা উচিত সরকারের। যেসব ফ্যাক্টরি গ্যাসের কারণে চালাতে পারছে না তাদের ব্যাংকের সকল ঋণ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। নতুন সরকার আসার আগেও আশ্বস্ত করেছে শিল্পখাতে গ্যাস সহায়তা দিবে কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে গ্যাস দিতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে, সেজন্য এখন ব্যবসায়ীদের ঋণগুলোর দায়ও সরকারকে নেওয়া উচিত।
Leave a Reply