দেশের ব্যাংক খাতে চলছে সংকট। বিশেষ করে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। কিছু বড় গ্রুপ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করায় এই সংকট বড় আকারে রুপ নিয়েছে। দেশের মানুষের কাছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর গুরুত্ব যেখানে তলানীতে সেখানে সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে শাহজালাল্ ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির বর্তমানে আর্থিক অবস্থা, আমানত, ঋণ বিতরণ ও মুনাফার প্রবৃদ্ধি, গ্রাহকসেবা উন্নয়নে ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ, এসএমই ও কৃষি খাতে ঋণ পরিকল্পনাসহ নানান বিষয়ে বিজনেস প্রতিদিন-এর সাথে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ।
বিজনেস প্রতিদিন: বর্তমানে আপনার ব্যাংকের অবস্থাকে কিভাবে মূল্যায়ণ করবেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আমাদের ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা খুবই ভালো। আমরা যদি মুনাফার কথা বলি তাহলে গত বছরের তুলনায় আমরা দিগুণ মুনাফা করেছি। আমরা ৩৬৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছি যা আগের বছর ছিল ১৬২ কোটি টাকা। সুতারাং আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছি। তাছাড়া আমাদের কোন তারল্য সংকট সংক্রান্ত কোন জটিলতা নেই। শুধু এ বছর নয় আমাাদের ব্যাংকে কখনো তারল্য সংকট ছিল না। বড় ক্রাইসিসের সময়েও আমাদের তারল্য সংকটে ভুগতে হয়নি। আমাদের মূল ক্যাপিটাল দিয়ে যে পরিমাণ ট্রেড বিজনেস করি, এই পরিমাণ বিজনেস আর কোন ব্যাংক করে না। সুতারাং আমাদের সব চেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ট্রেড ফাইন্যান্স। সব কিছু মিলিয়ে যদি আমি বলি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ২৫ বছরের ইতিহাসে এখন খুব ভালো অবস্থায় আছে। এই সময়ে শরীয়াহ্ ভিত্তিক অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমরা গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছি।
বিজনেস প্রতিদিন: আমানত, ঋণ বিতরণ ও মুনাফার ক্ষেত্রে গত এক বছরে কী ধরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। যেখানে পুরো ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ গ্রোথ ৬ শতাংশ সেখানে আমাদের গ্রোথ সাড়ে ৯ শতাংশ। আমাদের মুনাফার গ্রোথ ১৩.৪ শতাংশ। ইমপোর্ট গ্রোথ ২৪ শতাংশ, এক্সপোর্টের গ্রোথ ৬০ শতাংশ। এসমস্ত প্যারামিটারগুলো আমাদেরকে সামনে অগ্রসর হতে আরও বেশি সহায়তা করবে। গত ৫ বছরে আমাদের কোন লোন ক্লাসিপাইড হয়নি, এটা একটা ভালো দিক যে শাহজালাল ব্যাংক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারছে।
বিজনেস প্রতিদিন: দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি বলে মনে করেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঋণ খেলাপি। ঋণ খেলাপি দিন দিন বাড়ছে, এখন তো এটা চুড়ান্ত পর্যায় পৌঁছেছে। ঋণ খেলাপিটাকে যদি থামানো না যায় তাহলে ব্যাংকিং খাত থাকবে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে বর্তমানে ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুব একটা ভালো না। আমরা এমনো দেখেছি অনেক ব্যবসায়ী একটা সময় ভালো করেছে। নিকটতম সময়ে দেশের ব্যবসায়ীরা কোন ধরণের সমস্যায় পড়েনি, কিন্তু এখন অনেকটাই ব্যবসা মন্দায় ধাবিত হয়ে আছে অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তবে আমারাও অনেক আগে খেলাপী ঋণের কিছু সমস্যা ছিলাম। তবে আমাদের জন্য আশার দিক হলো গত ৬-৭ বছরে আমাদের কোন ঋণ খেলাপি হয়নি। আগের যে ঋণ খেলাপিটা ছিল সেটাই এখনো আছে তবে আমাদের যদি সামনে ঋণ খেলাপি না হয় এবং ইনভেস্টমেন্ট বাড়াতে পারি ঋণ খেলাপি যেটা আছে সেটাও কমে যাবে। তবে এখানে আমাদের লিগ্যাল সিস্টেম প্রয়োগের কোন বিকল্প নেই, যারা ইচ্ছা থাকা সত্তেও ঋণ পরিশোধ করছে না তাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল অ্যাকশন না নেওয়া হয় তাহলে যারা ভালো কাস্টমার তাদের উপরও খারাপ দিকটার প্রভাব পড়বে। এছাড়া যারা দুষ্ট প্রকৃতির তারা আরও সাহস পেয়ে যাবে এবং ঋণ খেলাপি বাড়াবে। তাই সব কিছু মাথায় রেখে কি ব্যবস্থা নিলে ঋণ খেলাপি কমানো যায়, তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া এখন খুবই প্রয়োজন।
বিজনেস প্রতিদিন: ইমলামি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ কি?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক দুইটা আইনে চলে, একটা হলো ব্যাংক আইন, আরেকটা হলো শরীয়াহ্ আইন। এছাড়াও একটি বিষয় আছে গভর্নেন্স। আমাদের তো করপোরেট গভর্নেন্স কেউ মানে না। করপোরেট গভর্নেন্স না মানাতেই কেউ শরীয়াহ্ আইন মানছে না। বরং আমাদের দেশের শরীয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর শরীয়াহ্ আইনের পাকপোকরের মধ্যে দিয়ে দেশ থেকে অনেক টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। আমাদের দেশ যেহেতু মুসলিম প্রধান দেশ তাই মুসলিম সেন্টিমেন্টটা কাজে লাগিয়ে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর উচিত সহজভাবে সেবাগুলো পৌঁছে দেওয়া কিন্তু এটার পরিবর্তে আমরা দেখলাম হিতে বিপরীত ঘটলো। এর মাধ্যমে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, এখন মানুষ শরীয়াহ্ ব্যাংকগুলোর বিষয়ে খারাপ ধারণা পোষণ করছে। তবে ৪৩ বছর পরেও হলেও একটা আশার দিক হলো বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিধিমালাগুলো যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা আশা করছি শরীয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো পরিচালনায় ভালো ফল বয়ে আনবে। এছাড়াও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।
বিজনেস প্রতিদিন: সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আপনারা কি ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: গ্রাহককে সাইবার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। বিশেষ করে সাইবার সমস্যা হতে পারে সেই সংক্রান্ত ইক্যুইপমেন্টগুলো আমরা ইতোমধ্যে আপডেট করেছি। আমাদের ডিজাস্টার রিকোভারীর বিষয়গুলোও নতুন করে সাজাচ্ছি। আমাদের সফটওয়ার রিলেটেড সব কিছু আমরা নতুনভাবে আপডেট করেছি। সব মিলে আমরা সিকিউরিটি বিষয়ে খুবই সতর্ক। বিশেষ করে সাইবার আক্রমণ বা অন্যান্য বিষয়ে আমরা খুবই কনসার্ন যাতে করে গ্রাহকদের সব কিছু নিরাপদ থাকে। যত ব্যয়বহুল হোক না কেন আমরা এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ এটা ব্যাংকের লাইফ লাইন। ভালো দিক হচ্ছে সাইবার সংক্রান্ত কোন ইস্যু এখন পর্যন্ত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের হয়নি। এখন যেভাবে আমরা এই বিষয়টি সামাল দিচ্ছি সামনেও সফলভাবে দিতে পারবো।
বিজনেস প্রতিদিন: কোন খাতগুলোকে বর্তমানে বেশি ঋণ দিচ্ছেন, কৃষি এবং এসএমই খাতে আপনাদের কি ধরণের কাজ হচ্ছে?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশে দশটি সাসটেইনেবল ব্যাংকের মধ্যে শাহজালাল ইসলামি ব্যাংক অন্যতম। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তিন ক্যাটাগরি আছে ইয়োলো, গ্রীন এবং রেড সেখানে আমরা গ্রীন ব্যাংক ক্যাটাগরিতে আছি। এসএমই খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বাধ্যবাদকতা আছে ২৫ শতাংশ আমরা তার অনেক বেশি পজিশনে আছি। কৃষি খাতেও আমাদের বেশ কিছু প্রোডাক্ট আছে। যার মাধ্যমে আমরা রিটেইল, করপোরেট এবং এসএমই এই খাতগুলোতে আমাদের একটা ভ্যালেন্স আছে। আমরা চেষ্টা করি আমরা যেন বেশি করেপোরেট ফোকাস না হয়ে পড়ি। আমরা চেষ্টা করি রিটেইল এবং এসএমই দিয়ে সেটা ভ্যালেন্স করতে পারি। এখন পর্যন্ত বলতে পারি ব্যাংককিং খাতে এমন কোন সুযোগ সুবিধা নেই যেটা আমাদের নেই। এর মাধ্যমে আমরা শুধু ইসলামী ব্যাংকিংয়ে নয় পুরো ব্যাংকিং খাতে একটা ভালো পজিশন ধরে রাখতে চাই। আমাদের ব্যাংকে বোর্ডের কোন চাপ না থাকায় আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারি। আমাদের বোর্ডে কোন একক কতৃত্ব নেই। কোন ব্যক্তির নামে ব্যাংক চলে না যা অন্যান্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখা যায়। যার ফলে পুরো ব্যাংক খাতে ভালো পজিশনে থাকার স্বপ্নও দেখি।
Leave a Reply