নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকগুলোকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নিতে হয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটা ব্যাংক খাতের ভেতরের গভীর সংকট ও দুর্বলতার বাহিঃপ্রকাশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের সহায়তা স্বল্প সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকগুলো নিজেরা দায়িত্ব না নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। তবে এই বড় অঙ্কের অর্থ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নয়।
এক দিন, সাত দিন, ১৫ দিন বা এক মাসের মতো স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তা হিসেবে নেওয়া হয়েছে এবং পরে ব্যাংকগুলো তা ফেরত দিয়েছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখা এবং নগদ সংকট মোকাবেলার জন্য এই সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকগুলো নিয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৯.১১ শতাংশ রেপোর মাধ্যমে, ৩৬.৬৭ শতাংশ নিশ্চিত তারল্য সহায়তা (এএলএস) এবং ৪.২২ শতাংশ স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) থেকে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো নিয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৯.৯৩ শতাংশ এসেছে ইসলামী ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ) থেকে এবং ৯.৮৮ শতাংশ বিশেষ তারল্য সহায়তা (এসএলএস) থেকে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা (ইএলএ) হিসেবে মোট ১৮ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা পেয়েছে।
এ বিষয়ে ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, গত বছর ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক নয়। এটি ব্যাংক খাতের গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত।
অনেক ব্যাংক নিজেদের তহবিল ব্যবস্থাপনায় দক্ষ না হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে। এর পেছনে রয়েছে দুর্বল সুশাসন, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং খেলাপি ঋণের বিস্তার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাত এখন বড় ধরনের মূলধন সংকটে রয়েছে।
২০২৫ সালে ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) নেমে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৩.০৮ শতাংশ। অর্থাৎ অনেক ব্যাংকের ঝুঁকি মোকাবেলার মতো পর্যাপ্ত মূলধন নেই।
ইসলামী ব্যাংক খাতে সিআরএআর নেমে ঋণাত্মক ৪৩.১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬.১৫ শতাংশ। আমানত ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটিও নেতিবাচক হয়েছে।
এ ছাড়া অনেক ব্যাংক বাধ্যতামূলক তারল্য সূচক, যেমন—লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও (এলসিআর), নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও (এনএসএফআর) এবং ইনভেস্টমেন্ট-ডিপোজিট রেশিও (আইডিআর) ঠিকভাবে বজায় রাখতে পারছে না।
ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে এখনো খেলাপি ঋণই রয়ে গেছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, খেলাপি ঋণ আরো বাড়লে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকিও বেশি।
করপোরেট খাতে ঋণের ঝুঁকিও বেড়েছে। মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ করপোরেট খাতে গেলেও ঝুঁকির বড় অংশও এই খাতেই কেন্দ্রীভূত।
ব্যাংকের বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। ২০২৫ সালের শেষে এই খাতের খেলাপি ঋণ ৩৩.৩২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে ঋণাত্মক ২৩.১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমানতও কমেছে।
তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রেমিট্যান্স বেড়েছে, রপ্তানি আয় স্থিতিশীল রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে। ২০২৫ সালের শেষে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৯ বিলিয়ন ডলারে (আইএমএফ পদ্ধতিতে ২৮.৫৯ বিলিয়ন ডলার)। এ ছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার ব্যবহারও বেড়েছে।
Leave a Reply