নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শ্রমিক না থাকলেও শ্রমিকদের মুনাফার অংশীদারত্বের জন্য গঠিত তহবিলে গত ছয় অর্থবছরে জমা হয়েছে ৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট (এফডিআর) ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে পাওয়া সুদ আয়ের ওপর ভিত্তি করে এই তহবিল গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ বেতন-ভাতা পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই অর্থের সুবিধা নিচ্ছেন। অথচ মূল ব্যবসায় পরিচালন লোকসান এবং শেয়ারহোল্ডারদের নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়ার চিত্রও রয়েছে।
ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) নামে পরিচিত এই তহবিলে প্রতিবছর ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, শ্রমিক না থাকা এবং পরিচালন মুনাফা না হওয়ার পরও এভাবে তহবিল গঠন করা যৌক্তিক নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ডিএসইর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই তহবিলে জমা হয় ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে জমা হয় ৯ কোটি ২ লাখ টাকা। পরবর্তী তিন অর্থবছরে যথাক্রমে ৫ কোটি ৩৫ লাখ, ৪ কোটি ৬ লাখ ও ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা তহবিল গঠন করা হয়।
পরিচালন লোকসানেও তহবিল: ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক চিত্রে তহবিল গঠন নিয়ে প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় ছিল ১০১ কোটি ৩ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ১৫০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ফলে পরিচালন লোকসান হয় ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
তবে পরিচালন কার্যক্রমের বাইরে এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ড-বিলে বিনিয়োগ থেকে ৯৪ কোটি ১১ লাখ টাকা সুদ আয় করে ডিএসই। এই সুদ আয়ের ওপর ভিত্তি করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকার ডব্লিউপিপিএফ গঠন করা হয়।
ওই অর্থবছরে এফডিআর ও ট্রেজারি বিলে ডিএসইর বিনিয়োগ ছিল ৫৭৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ছিল ২৩৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সুদ আয় যুক্ত হওয়ায় বছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয় ১৭ পয়সা।
অর্থাৎ, মূল পরিচালন কার্যক্রমে লোকসান হলেও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ আয় ডিএসইর মুনাফা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন: ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেছেন, শ্রমিক না থাকায় ব্যাংকগুলো সাধারণত এ ধরনের তহবিল গঠন করেনি। অথচ ডিএসইর কর্মকর্তারা মূল ব্যবসায় মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পরও এ তহবিলের সুবিধা পাচ্ছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি যৌক্তিক নয়; বিশেষ করে যখন শেয়ারহোল্ডাররা আর্থিক চাপে রয়েছেন।
ডিএসইর এক পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মকর্তারা উচ্চ বেতন-ভাতার পাশাপাশি গাড়ি ও বাড়ির জন্য বিনা সুদে ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা পান। এর পরও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থের সুদ থেকে গঠিত তহবিলের সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নামমাত্র লভ্যাংশ: ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিএসই ২০১৩ সালে ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও লেনদেনের সদস্যপদ পৃথক করার কাঠামো তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিএসইর পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৮০৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১ দশমিক ৭০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, যা শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা।
এদিকে, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারও মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ডিএসইর আয়-ব্যয়, তহবিল গঠন এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply