বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের ৩৫টি লাইফ বীমা কোম্পানির ২০২৪ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৬২৩ গ্রাহক ঝরে পড়েছে। নানামুখি সংকটে থাকা বীমা খাতে এভাবে গ্রাহক ঝরে পড়াকে বড় শঙ্কা হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গত ১২ ও ১৩ জুন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ল্যাপস বা তামাদি পলিসির অনিরীক্ষিত এই হিসাব প্রকাশ করা হয়।
তামাদি পলিসির সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোকে বছরের পর বছর তাগিদ দিয়ে আসছে খাতটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। একইসঙ্গে পলিসি তামাদি ঠেকাতে জারি করা হচ্ছে নতুন নতুন নির্দেশনা।
বীমা কোম্পানিগুলো বলছে- দ্বিতীয় বর্ষ থেকে কমিশন হার কম হওয়ায় গ্রাহকের নিকট এজেন্টদের না যাওয়া, গ্রাহকের নিকট ভুল তথ্য প্রদান, প্রিমিয়াম প্রদানে গ্রাহকের অনিহা, এজেন্টদের যোগ্যতার অভাব ও কোম্পানি পরিবর্তন, বীমার সুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং গ্রাহকের আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে বীমা পলিসি তামাদি হয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে সর্বোচ্চ পলিসি তামাদি হয়েছে সোনালী লাইফের, ৬৭ হাজার ৫৫৫টি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ডেল্টা লাইফ, কোম্পানিটির ৫৭ হাজার ৯৮১টি বীমা পলিসি তামাদি হয়েছে। এছাড়াও ন্যাশনাল লাইফের ৩১ হাজার ৬৬৭টি পলিসি তামাদি হয়েছে এ বছরের শুরুতে।
এর আগে ২০২৩ সালেও সর্বোচ্চ পলিসি তামাদি হয় সোনালী লাইফের, ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫২২টি। গেলো বছর ডেল্টা লাইফের ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫৯টি পলিসি তামাদি হয়। এ ছাড়াও পপুলার লাইফের ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭১২টি এবং ন্যাশনাল লাইফের ১ লাখ ৫১ হাজার ৪০৫টি পলিসি তামাদি হয় ২০২৩ সালে।
পলিসি তামাদি কী: সাধারণত বীমা গ্রাহক তার পলিসির অনুকুলে প্রিমিয়ামের কিস্তি প্রদানের নির্দিষ্ট তারিখ অতিবাহিত হওয়ার পরও গ্রেস পিরিয়ড বা অনুগ্রহকাল হিসেবে ৩০ দিন অতিরিক্ত সময় পেয়ে থাকেন। এই অনুগ্রহকালের মধ্যে যদি বীমা গ্রাহকের মৃত্যু হয়, তাহলেও বীমাটি কার্যকর বলে গণ্য হবে এবং পলিসির নমিনি বা ওয়ারিশরা বীমার প্রদেয় সুবিধা প্রাপ্য হবেন।
তবে অনুগ্রহকালের মধ্যে প্রিমিয়ামের অর্থ জমা দেয়া না হলে ‘বিচ্যুতি’ ঘটেছে বলে বিবেচিত হবে। দু’বছর নিয়মিত প্রিমিয়াম দেয়ার পূর্বে অনুরূপ ‘বিচ্যুতি’ ঘটলে সংশ্লিষ্ট তারিখ হতে বীমা পলিসিটি অচল ও তামাদি হয়েছে বলে গণ্য হবে। পলিসি তামাদি অবস্থায় গ্রাহকের মৃত্যু হলে পলিসির নমিনি বা ওয়ারিশরা বীমার প্রদেয় সুবিধা পাবেন না।
বীমা পলিসি কেন তামাদি হয়: বীমা কোম্পানিগুলো বলছে- নিড বেজড সেল তথা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বীমা পলিসি বিক্রি না করা, এজেন্ট কর্তৃক বীমা গ্রাহককে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বা ভুল তথ্য প্রদান, বীমা চালু রাখার সুফল সম্পর্কে গ্রাহকের অজ্ঞতা, এজেন্টদের যোগ্যতার অভাব ও বীমা কোম্পানি পরিবর্তন এবং গ্রাহকের আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে বীমা পলিসি তামাদি হয়ে যাচ্ছে।
কতিপয় কোম্পানি বীমা দাবি পরিশোধ না করে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি, প্রিমিয়ামের কিস্তি প্রদানে গ্রাহকের অনিহা, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে কমিশন হার কমে যাওয়ায় গ্রাহকের নিকট এজেন্টদের না যাওয়া, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং প্রবাসী গ্রাহকদের প্রিমিয়াম যথাসময়ে জমা না করার কারণে পলিসি তামাদি হচ্ছে বলেও দাবি বীমা কোম্পনিগুলোর।
এ ছাড়াও প্রিমিয়াম জমার পদ্ধতি যদি সহজ না হলেও পলিসি তামাদি হতে পারে। আবার কমিশন অ্যাডজাস্টমেন্ট করলে মিস সেলিং এর সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে প্রকৃত এজেন্ট তৈরি হয় না এবং পলিসি তামাদি হয়। এজেন্টের মধ্যে নৈতিকতা ও সততার জ্ঞান না থাকলে বা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ না দেয়া হলে তার দ্বারা বিক্রিত পলিসি তামাদি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তামাদি পলিসির সংখ্যা অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র পাঠানো চিঠির জবাবে এমন তথ্য দিয়েছে বেসরকারি খাতের লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো।
Leave a Reply