নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভূক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানিগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা। অধিকাংশ শেয়ারের দাম নেমেছে ফেসভ্যালুর নিচে। ৩৪ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩১টি ব্যাংকই লোকসান করেছে। লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিপরীতে মাত্র তিনটি ব্যাংক ২৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ হলে লোকসানের পরিমাণ আরও বড় হবে। বাজার মন্দার সময় ব্যাংক পরিচালনাকারীদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত, তহবিল ব্যবহারে অদক্ষতা, ফ্লোর প্রাইসের কারণে সময়মতো শেয়ার বিক্রি করতে না পারা এবং জাঙ্ক শেয়ারে বিনিয়োগের প্রবণতা এই লোকসানের মূল কারণ।
পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “গত বছর কোনো ক্ষেত্রেই সুশাসন ছিল না। অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও ব্যাংকের মধ্যে অনিয়ম ছিল। আইসিবির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও এর বাইরে নয়। অনিয়মের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।”
ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, লোকসান করা ৩১ ব্যাংকের মধ্যে শীর্ষে জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের লোকসান ৪০০ কোটি টাকা। এরপর আছে সোনালী ব্যাংক ৩৯৮ কোটি টাকা লোকসান নিয়ে। শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের বাকি তিনটি হলো— ইস্টার্ন ব্যাংক (৩৫৩ কোটি), সাউথইস্ট ব্যাংক (৩২৬ কোটি) ও এবি ব্যাংক (২৬১ কোটি)। সব মিলিয়ে এ পাঁচ ব্যাংকের লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।
বাকি ২৬ ব্যাংক লোকসান করেছে ১ হাজার ৮৯১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—এক্সিম ব্যাংক ২২৮ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ২১৭ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক ২১৬ কোটি, উত্তরা ব্যাংক ১৭২ কোটি, এনসিসি ব্যাংক ১৬৫ কোটি, রূপালী ব্যাংক ১৫৩ কোটি, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ১৩৩ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১০৭ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক ৮৩ কোটি, এসবিএসি ব্যাংক ৬৪ কোটি, এনআরবি ব্যাংক ৫৫ কোটি, পূবালী ব্যাংক ৪৮ কোটি, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ৪৬ কোটি, ইউসিবি ৩৩ কোটি, বেসিক ব্যাংক ৩১ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৩০ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ২৩ কোটি, সিটি ব্যাংক ১৯ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৪ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১৩ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ কোটি, মেঘনা ব্যাংক ১০ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংক ৯ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৭ কোটি, যমুনা ব্যাংক ১ কোটি ৫০ লাখ এবং ঢাকা ব্যাংক ১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে তিনটি ব্যাংক মুনাফা করেছে। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১২ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক ৭ কোটি ও প্রাইম ব্যাংক ৪ কোটি টাকা।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলোর লোকসানের বড় কারণ জাঙ্ক শেয়ারে বিনিয়োগ। কয়েকটি ব্যাংক বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিল, যা তাদের লোকসান বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হলে এর দর অর্ধেকে নেমে যায়। এছাড়া সমস্যাগ্রস্ত আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ও পিপলস লিজিংয়েও বিনিয়োগ করেছিল কিছু ব্যাংক।
বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটসের মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, একটি ব্যাংক কীভাবে জাঙ্ক শেয়ারে বিনিয়োগ করে? এসব বিনিয়োগের রিটার্ন অনিশ্চিত। অথচ ব্যাংকগুলোকে আমানতের মতো স্থায়ী দায় সামলাতে হয়।
এজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আলী ইমাম বলেন, ব্যাংকগুলোর পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় বড় সমস্যা আছে। কর্মকর্তাদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নেই। জামানতভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় তারা অভ্যস্ত, কিন্তু শেয়ারবাজারে দক্ষতার অভাবেই লোকসান হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে ডিএসইএক্স সূচক ১ হাজার ২৬ পয়েন্ট বা ১৬ শতাংশ কমেছে ঠিকই, তবে এটিই মূল কারণ নয়। দক্ষ পোর্টফোলিও ম্যানেজাররা মন্দা বাজারেও ভালো ফল করতে পারেন। শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য আলাদা দক্ষতা লাগে, যা ব্যাংকিং থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
Leave a Reply