নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে তারল্য সংকট সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন করে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
এ ঋণ তিন মাসের জন্য দেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে জানা গেছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, একীভূত করার আলোচনা শুরুর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে আমানত তুলে নেওয়ার চাপ বাড়তে থাকে। ফলে তারল্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়ে তারল্য সহায়তা দেয়।
একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংস (বিএবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চারটি ব্যাংক চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার পর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ৪১৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ৪৮২ কোটি টাকা; মোট ঋণ ১০ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক পেয়েছে ১ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা; মোট ঋণ ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে ১৬১ কোটি টাকা; মোট ঋণ ৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। আর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ৯৮ কোটি টাকা; মোট ঋণ ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে।
এছাড়া প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীর জন্য আমানত বীমা তহবিল থেকে মাথাপিছু সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা করে মোট প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ তহবিল থেকে অর্থ পরিশোধ শুরু হয়েছে।
গত সরকারের সময় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া। তবে সম্প্রতি তিনি পদত্যাগ করেছেন।
এর আগে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে যোগ দেননি। বর্তমানে নতুন এমডি নিয়োগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানান, ঋণের নামে আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে চলতি এপ্রিলের মধ্যে বিদেশি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি (এনডিএ) করতে হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সম্পদ উদ্ধার করে ব্যাংকগুলো সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৩ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা (৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা (৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা (৮০ দশমিক ৩৮ শতাংশ) এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা (৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ)।
Leave a Reply