নিজস্ব প্রতিবেদক: সাড়ে চার দশক আগে দেশে প্রথম কোনো রপ্তানিমুখী শিল্প এলাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। তারপর পর্যায়ক্রমে দেশে ১০টি এমন রপ্তানিমুখী শিল্প এলাকা তৈরি হয়েছে। গত ৪৫ বছরে এসব শিল্পাঞ্চলে ৭২৯ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এখান থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের। চাকরির সুযোগ পাওয়া এসব মানুষের একটি বড় অংশ হলেন নারী। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে থাকা প্রতি একর জমি থেকে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে।
দেশে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৮০ সালে। ওই বছর সরকার ‘বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) আইন’ পাস করে। এরপর ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সংস্থাটি। বুধবার (১৫ এপ্রিল) বেপজার ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
বেপজা প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরে ১৯৮৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপন করা হয়। এখন বেপজার অধীনে মোট ৮টি ইপিজেড ও দুই অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে।
বেপজার কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ খুবই সীমিত ছিল। সেই সঙ্গে রপ্তানির পরিমাণও কম ছিল। মূলত কৃষিই ছিল প্রধান অর্থনৈতিক খাত। এ জন্য কৃষির বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে ছিল না।
বেপজা বলছে, প্রতিষ্ঠার ৮–১০ বছরেই বেশ সফলতার ছাপ রাখে চট্টগ্রাম ইপিজেড। এ কারণে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ইপিজেড বানানো হবে। ১৯৯৩ সালে বানানো হয় দেশের দ্বিতীয় রপ্তানিমুখী অঞ্চল ‘ঢাকা ইপিজেড’। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার সাভার-আশুলিয়া এলাকা একটি শিল্পাঞ্চলে রূপ নিতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মোংলা, কুমিল্লা, নীলফামারী (উত্তরা) ও পাবনায় (ঈশ্বরদী) ইপিজেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পায়ন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী ও বন্দরনগরীর বাইরে।
নতুন ইপিজেড স্থাপনের পাশাপাশি সরকার বন্ধ কারখানাকে ইপেজেডে রূপ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নেয়। যেমন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত বন্ধ থাকা এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিলকে আদমজী ইপিজেড বানায়। আবার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী স্টিল মিলসকে কর্ণফুলী ইপিজেড বানায়। বর্তমানে সব মিলিয়ে আটটি ইপিজেড রয়েছে।
পণ্য বৈচিত্র্য কী: দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আসে বেপজার অধীন ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো থেকে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানি আয়ে ইপিজেডগুলোর অবদান ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। বেপজার অধীনে থাকা প্রতি একর জমি থেকে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে বলে জানিয়েছে বেপজা।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। এই নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে বেপজা। ইপিজেডগুলোতে নানা ধরনের রপ্তানিমুখী পণ্য তৈরি হয়। যদিও এখনো ইপিজেডগুলোর ৪৫০ কারখানার মধ্যে এক–তৃতীয়াংশ হচ্ছে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান। তবে বাকি কারখানাগুলো গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যামেরার লেন্স, প্রিন্টারের টোনার, বাইসাইকেল, চশমার ফ্রেম, পরচুল (উইগ), জুতা, কফিনের মতো নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি করছে।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ড্রোন তৈরির কারখানা। অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত বাইসাইকেল, বিশ্ব আর্চারি প্রতিযোগিতার ব্যবহৃত তির, সেনাবাহিনীর অ্যান্টি–রেডিয়েশন ইউনিফর্ম প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য তৈরি হচ্ছে ইপিজেডে।
৩৮ দেশের বিনিয়োগ: দেশের শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)। ২০১৮ সালে এনএসইজেডে জায়গা নিয়ে ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরেই সেখান থেকে পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে আটটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। এ ছাড়া ৩৪টি প্রতিষ্ঠান কারখানা নির্মাণ করছে।
বেপজার অধীনে থাকা ৮টি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট আয়তন ৩ হাজার ৫৫০ একর। এ ছাড়া যশোর ও পটুয়াখালীতে দুটি নতুন ইপিজেড তৈরি হচ্ছে। এর বাইরে রংপুর, সিরাজগঞ্জে আরও দুটি প্রস্তাবিত ইপিজেড রয়েছে। বেপজার অধীন ১০টি ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে মোট ৫৬৪টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন চালু রয়েছে ৪৪৮টিতে; আর নির্মাণকাজ চলছে ১১৬টির। বিশ্বের ৩৮টি দেশ এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ ছাড়া প্রধান বিনিয়োগকারী অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান ও ডেনমার্ক।
Leave a Reply