নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের দুই শাখায় জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ২৬ কোটি টাকার ভুয়া ঋণ সৃষ্টির ঘটনা ধরা পড়েছে। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখায় ৭৩টি ভুয়া হিসাব খুলে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেখানো হয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের পথেরহাট শাখায় এক প্রবাসী গ্রাহকের আমানত রসিদ জাল করে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, অনিয়মে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ মিললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পথেরহাট শাখার ব্যবস্থাপক মো. লোকমান হাছানকে শাস্তির বদলে প্রধান কার্যালয়ের ঋণ আদায় বিভাগে বদলি করা হয়েছে। শ্রীনগর শাখার কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রধান কার্যালয়ের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দুটি ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভেতরে একটি পক্ষ কাজ করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
প্রবাসীর আমানত রসিদ জাল: চট্টগ্রামের পথেরহাট শাখায় মোহাম্মদ শাহজাহান নামে এক প্রবাসী ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ‘ডাবল প্রফিট স্কিমে’ ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা আমানত রাখেন। অভিযোগ অনুযায়ী, শাখা ব্যবস্থাপক ওই আমানতের বিপরীতে নকল ডিপোজিট স্লিপ তৈরি করেন। গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে একই শাখা থেকে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়।
সম্প্রতি দেশে এসে গ্রাহক তার ডিপোজিট স্লিপের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে ‘আমানত সুরক্ষিত আছে’ মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, গ্রাহক বিদেশে থাকা অবস্থায় শাখা ব্যবস্থাপক মূল আমানত রসিদের আদলে নকল রসিদ তৈরি করে তা লিয়েন দেখিয়ে ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ করেন। প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে সুদসহ ওই গ্রাহকের হিসাবে প্রায় এক কোটি টাকা রয়েছে।
এ বিষয়ে লোকমান হাছান বলেন, গ্রাহকের ক্ষতির বিষয় নেই, বিষয়টি সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এটা নিতে পারি কখনও? যে কোনো কারণে একটা প্রতারণা হয়ে গেছে।’
৭৩টি ভুয়া হিসাব খুলে ঋণ সৃষ্টি: মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখায় আরও বড় অনিয়মের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন একই শাখার সেকেন্ড অফিসারের আইডি ব্যবহার করে কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে ৭৩টি ভুয়া ঋণ হিসাব খোলেন। এসব হিসাবের বিপরীতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ঋণ সৃষ্টি করে একটি বেসরকারি ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
বিষয়টি ধরা পড়ার পর তা সমন্বয়ের জন্য প্রথমে মুন্সীগঞ্জের শ্রীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ‘ক্রয়’ হিসাব থেকে ঋণ সমন্বয় দেখানো হয়। পরে শাখার জেনারেল লেজার (জিএল) থেকে আবার সমন্বয় করা হয়। তদন্তে এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্ত দলকে জানতে বলা হয়েছে, ৭৩টি হিসাবের বাইরে অন্য কোনো হিসাবে অনিয়ম হয়েছে কি না, অন্য কোনো শাখায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং অন্য কোনো কর্মকর্তা এতে জড়িত কি না।গত ২২ জানুয়ারি গঠিত তদন্ত দল প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ভুয়া ঋণের অর্থ সমন্বয় করা হয়েছে বলে ব্যাংক জানিয়েছে।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গাজীপুরের দুটি শাখায় দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটি অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা ছিল, যা এখন সমাধান হয়েছে। ৭৩টি হিসাবের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজ করতে গেলে অনেক সমস্যা হয়। ভুলে এরকম হয়েছিল। এখন সমাধান হয়ে গেছে।’ গাজীপুরে একই ধরনের ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সেখানেও আমার ক্ষতি করার জন্য একটি পক্ষ চেষ্টা করেছিল।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, অনিয়মে জড়িত পক্ষকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। অভ্যন্তরীণ কিছু জটিলতার কারণে এখনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দুই শাখায় প্রায় ২৬ কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একক প্রবেশাধিকার অপব্যবহার এবং দুর্বল তদারকি না থাকলে এ ধরনের ঘটনা দীর্ঘ সময় অগোচরে থাকার সুযোগ পেত না। সূত্র: সমকাল
Leave a Reply