নিজস্ব প্রতিবেদক: এক সময়ের প্রভাবশালী ‘সিকদার পরিবার’ এখন শুধুই এক করুণ পতনের নাম। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই পরিবারের প্রতাপ ও সম্পদ ধুলোয় মিশে গেছে। দেশের ব্যাংক খাতকে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণের নিচে চাপা দিয়ে পরিবারের সদস্যরা এখন দেশছাড়া। বিদেশের মাটিতে একের পর এক নিঃসঙ্গ প্রয়াণ ঘটছে এই পরিবারের শীর্ষ ব্যক্তিদের।
২০০৯ সাল পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি-র ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন জয়নুল হক সিকদার। এক পর্যায়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিজের স্ত্রী, সন্তান ও নাতিসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। ফলে ব্যাংকটি হয়ে ওঠে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। অনিয়ম ও কমিশনের বিনিময়ে বিতরণ করা ঋণের ভারে দেশের প্রথম প্রজন্মের এই ব্যাংকটি এখন ধ্বংসের মুখে। ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংকটির ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, আর সাধারণ গ্রাহকরা ফিরে পাচ্ছেন না তাদের আমানত।
সিকদার গ্রুপের ঋণের সবচেয়ে বড় অংশটি বিদ্যুৎ খাতের। পাওয়ার প্যাকের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে তারা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলেও তার বড় অংশই পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া আবাসন ও এভিয়েশন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, জনতা ও অগ্রণীসহ এক ডজন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর এসব ঋণ পরিশোধ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যা বর্তমানে সুদে-মূলে ১০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
২০২১ সালে জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার এবং অতি সম্প্রতি ছেলে রন হক সিকদার বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আরেক ছেলে রিক হক সিকদারও বর্তমানে অসুস্থ। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থ পাচারের মামলায় অভিযুক্ত এই ভাইয়েরা একসময় এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে গুলি করার চেষ্টার মতো বেপরোয়া কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।
আজ এই পরিবারের কোনো সদস্য দেশে নেই, ব্যবহৃত ফোন নম্বরগুলোও বন্ধ। যে পরিবারটি একসময় হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক ছিল, তাদের মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়ার মতোও আজ কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিপুল ঐশ্বর্য আর ক্ষমতার দাপট যে শেষ পর্যন্ত পাহাড়সম ঋণ আর একাকীত্বের কাছে হার মানে, সিকদার পরিবারের এই পতন আমাদের সেই রূঢ় বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়।
Leave a Reply