নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে মোটর বীমা ইস্যুর ক্ষেত্রে ট্যারিফ ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে অনৈতিকভাবে ‘নো ক্লেইম বোনাস’ (এনসিবি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অন্তত ১৮টি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ছাড়ের হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বছরে কোনো ক্লেইম না থাকলে কেবল পরবর্তী পলিসি নবায়নের সময়ই এনসিবি প্রযোজ্য।
বীমা দলিল, প্রিমিয়াম জমার রশিদ, চেকসহ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি নতুন বীমা পলিসিতেই এই ছাড় দিয়েছে, যা বীমা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ফলে একদিকে যেমন সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বীমা খাতে তীব্র অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সে একাধিক অনিয়ম: বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ছয়টি মোটর বীমায় বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার সত্যতা মিলেছে। ডেমরার মো. জুয়েল রানার গাড়ির ৪৫ লাখ বীমায় ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়। একইভাবে হাবিবা খাতুন ও ফরিদা ইয়াসমিনের ৩৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের পলিসিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত এনসিবি দেওয়া হয়।
গুলশান ও দিলকুশা ব্রাঞ্চের আরও কয়েকটি পলিসিতে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একাধিক ক্ষেত্রে রেকর্ড ৫০ শতাংশ এনসিবিও রয়েছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সে ৫টি পলিসি: বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের অন্তত পাঁচটি মোটর বীমায় বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ থেকে শুরু করে একটি পলিসিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। শান্তিনগর, গুলশান, মতিঝিল ও হেড অফিসসহ একাধিক শাখা থেকে এসব পলিসি ইস্যু করা হয়।
গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স: গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধেও অন্তত পাঁচটি পলিসিতে বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যা অধিকাংশই কমলাপুর ব্রাঞ্চ থেকে ইস্যু করা হয়েছে। এসব পলিসিতে ৪০ ও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য কোম্পানির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ: এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স অন্তত ৪টি মোটর বীমায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অবৈধ বোনাস দিয়েছে। প্রাইম ইন্স্যুরেন্স ৩টি বীমায় এবং রূপালী ইন্স্যুরেন্স ২টি বীমায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নো ক্লেইম বোনাস দিয়েছে। সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স এবং ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সও ২টি করে বীমায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে।
এছাড়া আরও ১০টি কোম্পানি অন্তত একটি করে বীমায় এই অবৈধ সুবিধা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো— গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স (৫০%), ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স (৫০%), প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স (৩০%), ইসলামী ইন্স্যুরেন্স (৩০%), নিটল ইন্স্যুরেন্স (৫০%), ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স (৩০%), ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স (৫০%), সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স (৫০%) এবং রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স।
বীমা আইন অনুযায়ী, নো ক্লেইম বোনাস কেবলমাত্র পূর্ববর্তী বছরে কোনো ক্লেইম না থাকলে পরবর্তী নবায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নতুন বীমা গ্রহণের সময় এই ধরনের কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ আইনগতভাবে নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া এনসিবি প্রদান বীমা আইন ২০১০-এর ধারা ৪৯ অনুযায়ী রিবেট বা কমিশন নিষিদ্ধকরণের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
আইনে এ ধরনের অনিয়মের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অনিয়ম অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপসারণ এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগও রয়েছে।
Leave a Reply