নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, করপোরেট গোষ্ঠীর দখল, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সুশাসনের অভাবে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে, একসময় আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ব্যাংক খাতের চলমান সংকটের সমাধান না হলে অর্থনীতির বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেন তারা।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’ আয়োজিত ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়: প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং খাত—জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে বক্তারা ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, এই ধারার মাধ্যমে একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাদের কারণে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, যারা ব্যাংক খাতে সংকট তৈরি করেছে, তাদের ফেরত আনতে আইনে নতুন ধারা কেন রাখা হলো, সেটি বড় প্রশ্ন। তিনি ব্যাংক রেজল্যুশন আইন পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, আমানতকারীসহ সব ধরনের গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অনেক আমানতকারী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো অর্থ তুলতে পারছেন না, যা উদ্বেগজনক। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নৈতিকতার জায়গায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, সেটিও পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত জরুরি বলেও উল্লেখ করেন।
অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিভিন্ন মহলের ভিন্ন মত থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে সবাই একমত—দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে এবং কলুষিত নীতিপ্রক্রিয়া সেই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বিনিয়োগ স্থবির, বেকারত্ব বাড়ছে এবং আমানতকারীরা নীরবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে লুটপাট হলে পুরো অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসে। ব্যাংক দখল নিয়ে যেসব তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে, তা দিয়ে থ্রিলার সিনেমা তৈরি করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতি একটি দখল হওয়া ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সেই ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। তিনিও ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের নতুন ধারা বাতিলের দাবি জানান।
ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অতীতে যে লুটপাট হয়েছে, সেগুলোকে মন্দ ঋণ হিসেবে মূল ব্যালান্সশিট থেকে আলাদা করে ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেন তিনি।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দারসহ অন্যরা।
Leave a Reply