মোহাম্মদ জহির উদ্দিন: আস্থার সংকট, অনিষ্পন্ন দাবি, দুর্বল সুশাসন এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের জীবন বিমা খাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকাসুরেন্সের সুশৃঙ্খল সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নের মাধ্যমে জীবন বিমা আবারও জাতীয় সঞ্চয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
জীবন বিমা একটি শিল্প নয়, জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত ভিত্তি-
একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার পরিপক্বতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো তার বিমা খাতের শক্তি। উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে জীবন বিমা শুধু ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার মাধ্যম নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সঞ্চয়, বিনিয়োগ, পুঁজিবাজারের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। জীবন বিমা তহবিল দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হলেও জীবন বিমা খাত সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। অনিষ্পন্ন দাবি, গ্রাহকের আস্থা হ্রাস, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার, পলিসি তামাদির উচ্চ হার এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এ খাতকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু বিমা কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সঞ্চয়, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। তাই জীবন বিমা খাতের সংস্কার এখন আর শুধু একটি শিল্পের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।
আস্থার সংকট এবং বর্তমান বাস্তবতা–
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যাত্রায় অভ্যন্তরীণ দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক দেশে জীবন বিমা খাত সেই মূলধন তৈরির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে এটি পরিবারকে অকাল মৃত্যু, দুর্ঘটনা কিংবা আয়ের উৎস হারানোর মতো ঝুঁকির বিরুদ্ধে আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আস্থার ঘাটতির কারণে অনেক সম্ভাব্য গ্রাহক জীবন বিমার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। আবার অনেক বিদ্যমান গ্রাহকও পলিসি চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এর ফলে একদিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ভিত্তিও দুর্বল হচ্ছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিদেশি ও দেশীয় বেসরকারি মিলিয়ে ৩৫টি জীবন বিমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থানে থাকলেও শিল্পের একটি বড় অংশ তারল্য সংকট, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং সুশাসনের সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
নতুন পলিসি বিক্রির গতি প্রত্যাশিত নয় এবং পলিসি ল্যাপসের হার (প্রায় ৮৩%)ও উদ্বেগজনক। আইডিআরএ-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জীবন বিমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে(প্রায় আট হাজার কোটি টাকা) , যা বিপুলসংখ্যক পলিসিধারীর সমস্যার প্রতিফলন। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বিমা পেনিট্রেশন হার এখনো অত্যন্ত নিম্ন, ফলে বিপুল জনগোষ্ঠী আর্থিক সুরক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
জীবন বিমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। গ্রাহক যখন বিশ্বাস করেন যে প্রয়োজনের সময় তাঁর বৈধ দাবি দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি হবে, তখনই তিনি বিমায় আস্থা রাখেন। দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, দুর্বল সেবা কিংবা অস্বচ্ছতা পুরো শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সংস্কারের শিক্ষা–
বিশ্বের সফল জীবন বিমা বাজারগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শুধু নতুন পলিসি বিক্রি নয়; বরং সুশাসন, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, আর্থিক সক্ষমতা এবং গ্রাহকের আস্থা।
ভারতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং ইনস্যুরেন্স ওম্বুডসম্যান((Ombudsman) ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে। মালয়েশিয়া করপোরেট গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল বিমা ও তাকাফুল ব্যবস্থার সমন্বয়ে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—আস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত-
চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের জীবন বিমা শিল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এ খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ব্যাংকঅ্যাশিওরেন্স (Bancassurance) জীবন বিমা বাজার সম্প্রসারণের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা, সুশাসন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকির ওপর। কমিশন নির্ভর বিভ্রান্তিকর বিক্রয়চর্চা (Mis-selling) প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইডিআরএ-এর সমন্বিত নজরদারি অপরিহার্য।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল আন্ডাররাইটিং, অনলাইন দাবি নিষ্পত্তি এবং রিয়েল-টাইম গ্রাহকসেবা চালু করা গেলে সেবার মান, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
টেকসই সংস্কারের জন্য নীতিগত রোডম্যাপ-
জীবন বিমা শিল্পের কার্যকর সংস্কারের পূর্বশর্ত হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত দিয়ে সিদ্ধান্ত থেকে পলায়ন পনীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমত: বৈধ বিমা দাবি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি এবং লাইফ ফান্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং আর্থিক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কার্যকর করতে হবে, যাতে পলিসিধারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পায়।
তৃতীয়ত: প্রিমিয়াম পরিশোধ, পলিসি ব্যবস্থাপনা, দাবি দাখিল ও দাবি নিষ্পত্তিসহ সব সেবা ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে।
চতুর্থত: ব্যাংকঅ্যাশিওরেন্স, ডিজিটাল বিমা ও ক্ষুদ্র বিমার সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
পঞ্চমত: দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, নৈতিক বিক্রয়চর্চা এবং গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের জীবন বিমা শিল্প আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি নয়; প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি, পরিচালনা পর্ষদ, পেশাজীবী ও গ্রাহকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই এ খাতকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব।
জীবন বিমা কোনো বিলাসী আর্থিক পণ্য নয়; এটি একটি আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তা কাঠামোর অপরিহার্য স্তম্ভ। জীবন বিমার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে নতুন পলিসির সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং বৈধ দাবি সময়মতো নিষ্পত্তি, সুশাসনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে।
আস্থা পুনর্গঠনই হবে বাংলাদেশের জীবন বিমা শিল্পের পুনর্জাগরণের পূর্বশর্ত। সেই আস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে জীবন বিমা খাত জাতীয় সঞ্চয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
Leave a Reply