নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংকট আরও গভীর হয়েছে। গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ১০ ব্যাংকেই রয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। ফলে এসব ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। শুধু মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক-এর অন্তর্ভুক্ত চার ব্যাংক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশই খেলাপি। ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে।
এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকেরও ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের অনেকেই দেশ ছেড়ে যাওয়ায় ঋণ আদায়ও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ঋণ পুনঃ তফসিল বা সুদে ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সম্পদ বিক্রি করে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য ঝুঁকিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবও এসেছে।
তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে খেলাপি ঋণের এই চাপ ব্যাংক খাতের তারল্য, মূলধন ও আমানতকারীদের স্বার্থের ওপর আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
Leave a Reply