নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের জীবন বিমা খাতে চলছে সংকট। এ খাতের বেশ কিছু কোম্পানির ধারাবাহিক অনিয়ম ও গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতায় পুরো খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ফলে প্রভাব পড়েছে পুরো বীমাতের ব্যবসায়। ব্যবসা ও লাইফ ফান্ডে ঘাটতিতে পড়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড—দুই ক্ষেত্রেই সংকোচনের মধ্যে রয়েছে কোম্পানিটি।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা কমেছে ১০৬ কোটি টাকা। একই সময়ে লাইফ ফান্ড বা জীবন তহবিল কমেছে ২৯৪ কোটি টাকা।
কোম্পানির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে তা কমে ৩৮৮ কোটি ৬৩ লাখ, ২০২২ সালে সামান্য বেড়ে ৩৯১ কোটি ৯৩ লাখ, ২০২৩ সালে ৩৮২ কোটি ৯৫ লাখ এবং ২০২৪ সালে ৩৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকায় নেমে আসে। ২০২৪ সালেই এক বছরে প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম আয় আরও কমে দাঁড়ায় ২৮২ কোটি টাকায়।
ফলে ২০২১ সালে মেঘনা লাইফের মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৩৮৮ কোটি টাকা। এরপর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সাল শেষে মোট প্রিমিয়াম আয় নেমে দাঁড়িয়েছে ২৮২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা কমেছে প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ।
জীবন তহবিলেও ধারাবাহিক পতন–
প্রিমিয়াম আয়ের পাশাপাশি মেঘনা লাইফের জীবন তহবিলও কয়েক বছর ধরে কমেছে। কোম্পানির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২১ সালে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৯২ লাখ, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৯৫ লাখ, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবন তহবিলের প্রবৃদ্ধি ২০২১ সালে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জীবন তহবিল প্রায় ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় জীবন তহবিল ২০২৫ সালে এসে কমেছে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা বা ১৬ শতাংশ কমেছে।
নতুন ব্যবসা কমেছে, বেড়েছে দাবির চাপ–
কোম্পানির ব্যবসা কমার পেছনে নতুন পলিসি সংগ্রহে দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মেঘনা লাইফের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ২০২৩ সালের ৭৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা থেকে ২০২৫ সালে কমে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কোম্পানির প্রতিবেদনে এ পতনের কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতির চাপ, মানুষের তারল্য সংকট এবং ভোক্তার আচরণে পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রাহকদের পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধ অব্যাহত থাকায় তহবিলের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৩৭৪ কোটি ৭৫ লাখ, ২০২২ সালে ৪২০ কোটি ৭৭ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৪৪৬ কোটি ৪১ লাখ টাকায় ওঠে। ২০২৪ সালে দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩৬৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে এসে তা কমে দাড়িয়েছে ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়।
ফলে ২০২২ ও ২০২৩ সালে কোম্পানির দাবি পরিশোধের পরিমাণ ওই বছরের মোট প্রিমিয়াম আয়ের চেয়েও বেশি ছিল। ২০২৩ সালে দাবি-প্রিমিয়াম অনুপাত ছিল ১১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালেও ছিল ১০৮ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২৫ সালেও প্রিমিয়াম আদায়ের চেয়ে বীমা দাবির পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয় ছিল ২৮২ কোটি টাকা আর বীমা দাবি পাওনা ছিল ২৮৬ কোটি টাকা।
বিনিয়োগ আয়ও কমেছে–
মেঘনা লাইফের জীবন তহবিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বিনিয়োগ আয়। কিন্তু পাঁচ বছরের হিসাবে এখানেও দুর্বলতা দেখা যায়। ২০২০ সালে কোম্পানির বিনিয়োগ আয় ছিল ৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে তা কমে ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ, ২০২২ সালে ৮৫ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নেমে আসে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে বিনিয়োগ আয় দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
কোম্পানির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক চাপ, বাড়তি দাবি পরিশোধের দায় এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগ আয়ে দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমলেও মূল সমস্যা কাটেনি-
অন্যদিকে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমেছে। ২০২১ সালে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল ১০৭ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে কমে ৬৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কমিশন ব্যয়ও ৪৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা থেকে কমে ২৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা হয়েছে।
অর্থাৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কিছুটা অগ্রগতি থাকলেও প্রিমিয়াম আয়, নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ আয় ও জীবন তহবিলের ধারাবাহিক সংকোচন কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো জীবন বিমা কোম্পানির ব্যবসা ও জীবন তহবিল যদি দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ সময়মতো সমস্যা শনাক্ত ও সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় চাপ তৈরি হতে পারে।
মেঘনা লাইফের ২০২০ ও ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ছয় বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা ও জীবন তহবিল—দুই সূচকেই উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। ফলে নতুন ব্যবসা বাড়ানো, গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জীবন তহবিল শক্তিশালী করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ইনচার্জ) মোহাম্মদ তারেক এফসিএ-এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তাই এই বিষয়ে কোম্পানির কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Leave a Reply