নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান করেও এখন সবচেয়ে অসহায় দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। ধারদেনা করে কিংবা সারা জীবনের সব পুঁজি ব্যবসা বা শিল্পে খাটিয়ে, সেখানকার আয়ের একটি বড় অংশ সরকারকে কর দিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না তাঁদের। নানান ছুতায় সব সরকারের সময়ই ‘শিকার’ বানানো হয় ব্যবসায়ীদের। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, ব্যবসাকে জিম্মি করে নিজেদের স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করে।
ভোগান্তিতে পেলে ব্যবসায়িদের। প্রয়োজন ফুরালে মামলা-হামলাসহ নানান ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ফেলে জেল-জরিমানা আর হয়রানিতে জীবন বিষিয়ে তোলে।
ওয়ান-ইলেভেন, নির্দলীয় অথবা রাজনৈতিক—সব সরকারই ব্যবসায়ীদের দেখে সন্দেহের চোখে। যতই ‘অভাগা ব্যবসায়ীরা’ ছাই-ভষ্ম থেকে বারবারই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন, তার পরও কোনো না কোনো ষড়যন্ত্র ঠিকই তাঁদের ব্যবসা-উদ্যোগকে টার্গেট করে পেছনে লেগে থাকে।
বিভিন্ন সরকারের সময় ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারগুলোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া যায়।
জানা যায়, জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখে কিংবা সরকারের তহবিলে বেশির ভাগ রাজস্ব দিয়েও কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কখনো ভুলনীতি, কখনো স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় তাঁদের শিল্প-ব্যবসা-বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া হরতাল-অবরোধ, প্রাকৃতিক কিংবা মানুষের তৈরি দুর্যোগও তাঁদের শিল্প বা উদ্যোগের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাঁরা জানান, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে নিরাপত্তাহীনতা, মামলা-হামলা, উচ্চ সুদের হার, ডলারের উচ্চমূল্য, জ্বালানি সংকট, অতিমাত্রায় ইউটিলিটির খরচসহ নানান সংকটে তাঁদের ব্যবসা-শিল্প এখন নাজুক পরিস্থিতি পার করছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রের ‘সন্দেহ বাতিক’ চোখ। আগের সরকারের সময়ের ‘সুবিধাভোগী’ তকমা দিয়ে পক্ষভুক্ত করার ঝড়ও তাঁদের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা এখন চরমভাবে শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন।
সরকার সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন ও সহায়তা দিতে এসংক্রান্ত বাছাই কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির অন্যতম সদস্য ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শিল্পপতিদের আস্থায় নিতে হবে। বিশেষ করে তাঁদের কারখানায় কোনো ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিকে অ্যাক্টিভ করতে হবে। যেকোনো লোক এসে, ছাত্র-ছাত্রীরা এসে মহাখালীতে রাস্তা দখল করে ফেলল, কেউ এসে আমাদের লাইফ লাইন রাস্তা বন্ধ করে দিল—এয়ারপোর্টে কেউ যেতে পারছে না। দিস মাস্ট স্টপ। টেক ইট অর লিভ ইট। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রাইওরিটি দিতে হবে।
তিনি বলেন, সত্যিকারের যাঁরা উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী, যাঁরা সমস্যায় পড়ে গেছেন, যাঁদের ব্যাংক ব্যাকআপ করতে রাজি আছে, সব নিয়মনীতি মেনে যদি মনে করা হয়, কিছু টাকা পেলে তাঁরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, সে ক্ষেত্রে আমরা সবাই ভাবছি তাদের কিভাবে সহায়তা করা যায়। আমি সরকারের তিনটি কমিটিতে কাজ করছি। কিভাবে ৫০ কোটি টাকার ওপরে ঋণগুলোকে রিভিউ করা যায়, এ ব্যাপারে আমরা অলমোস্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় আরো জানা যায়, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২-২৩ সালের একটি জরিপের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ২৩.১০ শতাংশ। এর মধ্যে বড় শিল্পের অবদানই ১১.২০ শতাংশ। বড় শিল্পে ভর করে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার আকারও বড় হচ্ছে।
বিবিএসের ২০২২ সালের আরেকটি জরিপের তথ্য বলছে, দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার আকার পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ৮৬ লাখ মানুষ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় জড়িত। ২০২৩ সালে বিবিএসের আরেকটি জরিপ বলছে, দেশের সাত কোটি ১০ লাখ মানুষ কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। এর মাত্র ৫ শতাংশেরও কম সরকারি চাকরিতে। ফলে বেশির ভাগই বেসরকারি কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। সরাসরি ব্যক্তি খাতেই কাজ করছেন ৪৭.৯ শতাংশ মানুষ। সুতরাং তথ্য-উপাত্ত বলছে, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাত। যার নেতৃত্ব দেন দেশের শিল্পোেদ্যাক্তারা। অথচ তাঁরাই এখন নানান সংকটের মুখে।
একটা সময় হরতাল-অবরোধে বিপুল ক্ষতি হতো ব্যবসার। ২০১৫ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জানিয়েছিল, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে শুধু হরতাল অবরোধে তাঁদের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনার ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছিল। ওই সময় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক গবেষণায় বলা হয়, করোনাকালে বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ ব্যবসায়ী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
এ রকম ছোটখাটো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরাসহ নানান দুর্বিপাকে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়। কিন্তু এর বাইরে বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন, বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও শ্রমিক অসন্তোষেরও শিকার হয় ব্যবসা ও শিল্প-কারখানা। ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁরা প্রাকৃতিক কিংবা মানুষের তৈরি সব সংকট কাটিয়েও নিজেদের শিল্পকে চালু রাখতে চান। মানুষ যাতে কর্মহীন না হয়, সরকার ও দেশ যাতে লাভবান হয়—এই প্রচেষ্টা তাঁদের থাকে। তবে কখনো কখনো সরকারের ‘সন্দেহ বাতিক’ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যখন তাঁরা টার্গেটে পরিণত হন, তখন টিকে থাকাই দায় হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, ওয়ান-ইলেভেন সরকার তাঁদের বিএনপি জোট সরকারের ‘পক্ষভুক্ত’ করে যে ক্ষতি করে; আওয়ামী লীগ সরকার এসেও সন্দেহমুক্ত হতে পারেনি। বরং এটাকে অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে, তাঁদের শিল্প-ব্যবসাকে জিম্মি করে তাদের পক্ষের তকমা দেওয়ার চেষ্টা করে।
তাঁরা আরো জানান, শিল্প-ব্যবসায় লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, এসব শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, যার একটি বড় অংশ ব্যাংক ঋণ। সরকারের রোষানলে পড়লে তাঁদের শিল্প-ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ কাজ হারাবে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি পাবে না। এত সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের কেউ কেউ শিল্প রক্ষায় সরকারের পক্ষ নিতে বাধ্য হয়েছে। তাঁরা কোনো রাজনীতি করেন না। বরং দুষ্টু রাজনীতির চালের শিকার হয়ে সরকারের বলির পাঁঠা হন তাঁরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেক ব্যবসায়ীকে বিএনপি জোট সরকারের সুবিধাভোগী আখ্যা দিয়ে তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়। ওই সময় তাঁদের অনেককে জেলও খাটতে হয়। অনেকে ব্যবসা বাঁচাতে সরকারের পক্ষ নিতে বাধ্য হন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে টানা ১৬ বছরে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরকারকে সায় দিতে হয়েছে তাঁদের অনেককে।
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারানোর পরও ব্যবসায়ীদের অনেককে ‘পক্ষভুক্ত’ করার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই তাঁদের অনেককে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পে-ব্যবসায়। তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থাহীনতা কাজ করছে। ব্যবসায় বাড়তি খরচ ও নানামুখী সংকটের পাশাপাশি তাঁদের ‘পক্ষভুক্ত’ করার কারণে শিল্প ও ব্যবসা রুগ্ণ হয়ে পড়ছে। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেও ব্যবসায়ীরা নিজেদের এখন সবচেয়ে অসহায় বোধ করছেন।
তাঁরা বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করে আর সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব দিয়েও তাঁরাই আজ নাজুক পরিস্থিতির শিকার। সরকার যেখানে তাঁদের আস্থায় নিয়ে পাশে থাকার কথা, সেখানে তাঁদের দেখা হচ্ছে সন্দেহের চোখে।
তাঁরা দাবি করেন, ব্যবসায়ীদের প্রকৃতই কোনো দল নেই। তাঁরা সরাসরি কোনো রাজনীতি করেন না। পরিস্থিতির শিকার হয়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী বিশেষ কারণে আগের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য হলেও প্রকৃতই তাঁরা তাঁদের শিল্প বাঁচাতে চেয়েছেন। এখনো তাঁরা দেশ, অর্থনীতি ও মানুষের স্বার্থে তাঁদের শিল্পকেই অগ্রাধিকার দেবেন। তাঁরা সব সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে চান। কিন্তু যে সরকারই আসে, তারা মনে করে ব্যবসায়ীরা আগের সরকারের লোক। বিষয়টিকে একটি ভ্রান্ত ধারণা বলেই অভিহিত করেন ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, ব্যবসা-উদ্যোগ এখন ক্রান্তিকাল পার করছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। পতিদিনই বন্ধ হচ্ছে কোনো না কোনো শিল্প-কারখানা। এরই মধ্যে বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে মাঠে আন্দোলন করছেন শ্রমিকরা। তাঁরা ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধ করছেন। এতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন না, বিদেশি বিনিয়োগও তলানিতে। সর্বশেষ হিসাব বলছে, বিদেশি বিনিয়োগ ৭১ শতাংশ কমেছে। উচ্চ সুদের হার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের উচ্চ দরও ভোগাচ্ছে মানুষকে। যার ফলে ব্যবসায় মন্দা চলছে। এতে সরকারের আয় কমেছে। যার প্রভাবে রাজস্ব ঘাটতি ৫৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
Leave a Reply