নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা চেয়েছেন। পাশাপাশি পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধি কমিয়ে একজন করার ও গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
এই প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদে উপস্থাপনের পর সম্প্রতি খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে পাঠানো পৃথক চিঠিতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণ মন্ত্রীর সমান হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বাড়বে। এতে নীতিগত স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হবে।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করেন। এতে তাঁদের নীতিগত স্বাধীনতা বজায় থাকে এবং সরকারের অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় সম্ভব হয়।
গভর্নর বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।”
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন গভর্নর, তিনজন সরকারি প্রতিনিধি (অর্থসচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব), একজন ডেপুটি গভর্নর এবং চারজন বেসরকারি সদস্য।
খসড়া অনুযায়ী, সরকারি প্রতিনিধি তিনজন থেকে কমিয়ে একজন করা হবে এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্য চারজন থেকে বাড়িয়ে ছয়জন করা হবে।
গভর্নরের চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদেও পেশাদার ও স্বাধীন সদস্য বাড়ানো প্রয়োজন। যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধিত্ব সীমিত বা নেই।
গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে তিন সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্ব দেবেন সাবেক অর্থমন্ত্রী, অর্থ উপদেষ্টা বা সাবেক গভর্নর। এই কমিটি রাষ্ট্রপতি ও সরকারের কাছে যোগ্য প্রার্থীর নাম সুপারিশ করবে।
অপসারণ প্রক্রিয়ায়ও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে। অভিযোগ উঠলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি তা পর্যালোচনা করবে। নির্বাহী কর্তৃপক্ষের একক সিদ্ধান্তে অপসারণ করা যাবে না।
খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব বেতন কাঠামো নির্ধারণ, পদ সৃষ্টি এবং শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিজেই দিতে পারবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে নিজস্ব বিধি প্রণয়ন ক্ষমতাও সংযোজন করা হবে।
ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে ‘সমন্বিত তদারকি কাঠামো’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কাঠামো ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াবে বলে গভর্নরের বিশ্বাস।
এছাড়া ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
সাবেক ব্যাংকারদের মতে, গভর্নরকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের বদলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। আবার সরকারি প্রতিনিধি কমলে নীতিনির্ধারণে জনস্বার্থ ও রাজস্বনীতি উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের জবাবদিহি থাকবে জাতীয় সংসদের কাছে। সংসদীয় কমিটি ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনে শুনানিও নেবে। তবে সাবেক ব্যাংকারদের মতে, সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা বাড়াতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply