নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের জীবন বীমা খাতের মোট লাইফ ফান্ড ৩৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও সাতটি কোম্পানি এখনো ঋণাত্মক তহবিলে রয়েছে। সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যার জীবন তহবিল ঋণাত্মক প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণেও শীর্ষে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জানা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটির অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে জমা দেওয়া জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জীবন তহবিল কোনো জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের অন্যতম প্রধান সূচক। অন্যদিকে অনিষ্পন্ন দাবি বাড়তে থাকা মানে পলিসিধারীদের পাওনা অর্থ সময়মতো পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণাত্মক জীবন তহবিল ও উচ্চ অনিষ্পন্ন দাবি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট জীবন তহবিল দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৩৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে এ তহবিল ছিল ৩৬ হাজার ৮৩৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খাতটির জীবন তহবিল বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা।
লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক থাকা কোম্পানিগুলো হলো-
সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে থাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জীবন তহবিল ঋণাত্মক ৯৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি ৩১২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে- বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জীবন তহবিল ঋণাত্মক ৫৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২৬ লাখ টাকা।
খাতের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, জীবন তহবিলের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। মার্চ শেষে মেটলাইফ বাংলাদেশের জীবন তহবিল দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬৮৪ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা পুরো খাতের মোট তহবিলের প্রায় ৪৩ শতাংশ। ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জীবন তহবিল ৬ হাজার ৮৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশনের তহবিল ৩ হাজার ১৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জীবন বীমা খাতের মোট জীবন তহবিল ছিল ৩৪ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তহবিল বেড়ে হয় ৩৬ হাজার ৮৩৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে তা ৩৮ হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে।
বীমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবন তহবিল মূলত পলিসিধারীদের ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের নিরাপত্তা তহবিল। তাই কোনো কোম্পানির জীবন তহবিল দীর্ঘ সময় ঘাটতিতে থাকলে এবং একই সঙ্গে অনিষ্পন্ন দাবি বাড়তে থাকলে গ্রাহকের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগ আয় বাড়ানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পলিসি ল্যাপস কমানো এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি না করা গেলে ভবিষ্যতে পুরো জীবন বীমা খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
আইডিআরএর পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, লাইফ ফান্ডে কোনো টাকা না থাকা কোম্পানিগুলর উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘বীমাকারীর রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেই আদলে কাজ করলে কোম্পানিগুলোর গ্রাহকরা টাকা পাবেন বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
Leave a Reply