মোহাম্মদ জহির উদ্দিন: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো ব্যক্তি ও পরিবারকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। একটি গুরুতর অসুস্থতা মুহূর্তেই বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ঠেলে দেয়। চিকিৎসা ব্যয়ের এই চাপ শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য বীমা আর কেবল একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage—UHC), সামাজিক সুরক্ষা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
স্বাস্থ্য বীমা কেন এখন জাতীয় অগ্রাধিকার- কোনো দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো কিংবা শিল্পায়নের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; সেই উন্নয়নের স্থায়িত্ব নির্ভর করে জনগণের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার ওপরও। অসুস্থতার কারণে যদি একটি পরিবার সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয় কিংবা দারিদ্র্যের মধ্যে নেমে যায়, তাহলে তার প্রভাব কেবল পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; জাতীয় উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কারণেই উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশ স্বাস্থ্য বীমাকে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। স্বাস্থ্য বীমার মূল উদ্দেশ্য শুধু চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ নয়; বরং অসুস্থতার আর্থিক ঝুঁকি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দিয়ে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই করে তোলা।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু স্বাস্থ্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখনো একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশের Health Economics Unit (HEU)-এর সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৮.৯ শতাংশ এখনো ব্যক্তি ও পরিবারকে নিজস্ব অর্থ (Out-of-Pocket Expenditure—OOP) থেকে বহন করতে হয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি এবং আর্থিক সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ যখন ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য বীমাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: পরিসংখ্যান যা বলছে- সরকারি ও গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এখনো মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ রয়েছে। ফলে বিপুল জনগোষ্ঠী অসুস্থতার আর্থিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে কার্যত কোনো সুরক্ষা ছাড়াই জীবনযাপন করছে।
সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ও এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় বোঝা সরাসরি ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর বর্তায়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো প্রায়ই সঞ্চয় ভাঙে, ঋণ নেয় কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও বিলম্বিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর অধিকাংশই অসংক্রামক রোগ—হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং কিডনি রোগের কারণে ঘটে। এসব রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাকে দ্রুত দুর্বল করে দেয়। ফলে স্বাস্থ্য বীমার অনুপস্থিতিতে স্বাস্থ্য সংকট দ্রুত অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
কেন পিছিয়ে স্বাস্থ্য বীমা- বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমার বিকাশে কয়েকটি কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। জনসচেতনতার অভাব, বীমা খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতি, হাসপাতাল ও বীমা কোম্পানির মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা, অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য উপযোগী পণ্যের অভাব এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি, অ্যাকচুয়ারিয়াল বিজ্ঞান ও ডিজিটাল ক্লেইম ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবলের স্বল্পতা—সব মিলিয়ে এ খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত, স্বচ্ছ, ন্যায্য ও প্রযুক্তিনির্ভর দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা না গেলে স্বাস্থ্য বীমার ব্যাপক সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা- WHO ও বিশ্বব্যাংকের Tracking Universal Health Coverage: 2025 Global Monitoring Report অনুযায়ী, ২০০০ সালে বৈশ্বিক UHC Service Coverage Index ছিল ৫৪; ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৭১-এ পৌঁছেছে। একই সঙ্গে উচ্চ Out-of-Pocket ব্যয় এখনো কোটি কোটি মানুষকে আর্থিক দুর্ভোগে ফেলছে। তাই সরকারি স্বাস্থ্য অর্থায়ন, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কার্যকর স্বাস্থ্য বীমা কাঠামোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
জাপান, জার্মানি, থাইল্যান্ড, ভারত ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, সফল স্বাস্থ্য বীমার ভিত্তি হলো—দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বিস্তৃত অংশগ্রহণ, কার্যকর ঝুঁকি তহবিল (Risk Pool), প্রযুক্তিনির্ভর দাবি ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং জনগণের আস্থা।
বাংলাদেশের জন্য নীতিগত রোডম্যাপ- বাংলাদেশের Health Care Financing Strategy (2012–2032) বাস্তবায়নে সরকারি ও বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে গ্রুপ স্বাস্থ্য বীমা চালু, ব্যাংকঅ্যাশিওরেন্সের মাধ্যমে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য বীমার সম্প্রসারণ, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড (EHR) ও ডিজিটাল ক্লেইম অবকাঠামো গড়ে তোলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার বৃদ্ধি, অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য ভর্তুকিনির্ভর মাইক্রো-হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু এবং স্বাধীন Health Insurance Ombudsman প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য বীমা: ব্যয় নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগ- বিশ্বব্যাংক, WHO এবং OECD-এর বিভিন্ন গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কেবল সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করে না; এটি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা সুরক্ষা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। একজন সুস্থ নাগরিকই একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান মানবসম্পদ। তাই স্বাস্থ্য বীমাকে ব্যয় নয়; বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য অর্থায়নে মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। স্বাস্থ্য বীমার সফলতা নতুন পলিসির সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং প্রয়োজনের সময় মানুষ কত দ্রুত, স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সম্মানজনকভাবে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে এবং চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে কোনো পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে কি না—তার মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে।
সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বেসরকারি খাতের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং জনগণের আস্থা—এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
স্বাস্থ্য বীমা কোনো বিলাসী আর্থিক পণ্য নয়; এটি একটি আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তির অংশ। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন অসুস্থতার কারণে কোনো পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে না। তাই স্বাস্থ্য বীমাকে ব্যয় হিসেবে নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানবসম্পদ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার এখনই সময়।
লেখক: মোহাম্মদ জহির উদ্দিন
সাবেক উপ-ব্যবস্থানা পরিচালক (অপারেশন) এবং সিইও (ভারপ্রাপ্ত) প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।
Leave a Reply