নিজস্ব প্রতিবেদক: লভ্যাংশ দিতে দেরি, সঙ্গে নিয়ম ভেঙে প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার অভিযোগ—এবার বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি আফতাব অটোমোবাইলস। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিন পরিচালক, তৎকালীন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবকে ব্যক্তিগতভাবে মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন—বিএসইসি।
বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের আদেশ অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পাওনা অবণ্টিত লভ্যাংশ পরিশোধ করতে হবে আফতাব অটোমোবাইলসকে। নির্ধারিত সময়েও লভ্যাংশ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্টদের প্রতিদিন আরও ১০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হবে। তবে জরিমানা পরিশোধ করলেও বিনিয়োগকারীদের পাওনা লভ্যাংশ দেওয়ার দায় থেকে কোম্পানি কোনোভাবেই মুক্ত হবে না বলে জানিয়েছে কমিশন।
বিএসইসির আদেশে চেয়ারম্যান শফিউল ইসলামকে ৩০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলামকে ৩০ লাখ, তিন পরিচালক খালেদা ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম ও ফারহানা ইসলামকে ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি তৎকালীন সিএফও সাহাদাত হোসেন মিয়াকে ১০ লাখ এবং কোম্পানি সচিব রাহাত মাহমুদকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের লভ্যাংশ নিয়ে। ওই অর্থবছরের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে আফতাব অটোমোবাইলস। ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় বা এজিএমে শেয়ারহোল্ডাররা সেই লভ্যাংশ অনুমোদনও করেন। নিয়ম অনুযায়ী, এজিএমে অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পরিশোধ করার কথা। সে হিসাবে ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারির মধ্যেই পুরো লভ্যাংশ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল কোম্পানিটির।
কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। বিএসইসিকে দেওয়া ব্যাখ্যায় কোম্পানিটি জানায়, মোট প্রদেয় লভ্যাংশের ৮৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি অর্থ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আর্থিক সংকটের কারণে সেটিও সম্ভব হয়নি। পরে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করে কোম্পানি।
তবে এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি বিএসইসি। কমিশনের মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পরিশোধ করা আইনি বাধ্যবাধকতা। আর্থিক সংকটকে সেই বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
শুধু লভ্যাংশ আটকে রাখাই নয়, বিতরণ-সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক কমপ্লায়েন্স রিপোর্টও নির্ধারিত সময়ে জমা দেয়নি আফতাব অটোমোবাইলস। বিধান অনুযায়ী, লভ্যাংশ বিতরণ শেষ হওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই নিয়মও মানেনি কোম্পানিটি।
এরপর ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর কোম্পানির ইস্যুয়ার, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিব ও সিএফওকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ। পাশাপাশি শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে কোম্পানির পক্ষে বক্তব্য দেন কোম্পানি সচিব রাহাত মাহমুদ ও সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজার নাফিস আহমেদ।
বিএসইসির ভাষ্য, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত। নির্ধারিত সময়ে লভ্যাংশ পরিশোধ না করা এবং প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা না দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ড শেয়ারবাজারের শৃঙ্খলা ও সুশাসনের পরিপন্থী।
আর তাই এবার শুধু কোম্পানিকে দায়ী না করে লভ্যাংশ পরিশোধ ও আইন পরিপালনের দায়িত্বে থাকা পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবেও জরিমানার আওতায় এনেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সব মিলিয়ে আফতাব অটোমোবাইলসের ওপর বিএসইসির কড়া বার্তা—বিনিয়োগকারীদের পাওনা নিয়ে কোনো গাফিলতি কিংবা আইন লঙ্ঘন মেনে নেওয়া হবে না।
Leave a Reply