1. baiozidkhan@gmail.com : admin_bizp :
দাবি পরিশোধে ভয়াবহ চিত্র বীমা খাতে, শঙ্কায় গ্রাহকরা - Business Protidin

দাবি পরিশোধে ভয়াবহ চিত্র বীমা খাতে, শঙ্কায় গ্রাহকরা

  • সর্বশেষ আপডেট : সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিপদের বন্ধু বিমা হলেও বাংলাদেশে তার চিত্র ভিন্ন। বিমা হওয়ার কথা ছিল আস্থার প্রতীক, সেটিই এখন অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবন বিমা কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে গ্রাহকের দাবির টাকা পরিশোধ করছে না। ফলে বকেয়া বিমা দাবির পরিমাণ বেড়েই চলছে। ২০২৫ সাল শেষে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোতে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার বেশি দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। যা এক কথা বিমা খাতে ভয়াবহ চিত্র যা ক্রমেই বাড়ছে।

জানা যায়, গ্রাহকদের বিমা দাবির টাকা না দেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানিগুলো আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে অর্থ খরচ করছে। দেশে ব্যবসা করা ৩৫টি বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে ২০টিই ২০২৫ সালে আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে। কিছু কোম্পানি গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে হয়রানি করছে। দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকরা ঠিকমতো বিমা দাবির টাকা পাচ্ছেন না। এতে দেশের সার্বিক বিমাখাতে ইমেজ সংকট তৈরি হওয়ায় মানুষ বিমা করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এ কারণে বিমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম বাড়ছে না। ফলে ব্যবস্থাপনা খাতের ব্যয় আইনের মধ্যে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

২০২৫ সাল শেষে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোতে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বিমা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। বছরটিতে গ্রাহকরা বিমা কোম্পানিগুলোতে ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৫ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন করেন। বিপরীতে কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বছরটিতে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোতে মোট ২৮ লাখ ৪৩ হাজার ৩৬৮ জন গ্রাহক বিমা দাবির টাকা চেয়ে আবেদন করেন বা দাবি উত্থান করেন। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫২ জন গ্রাহককে বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বিপরীতে ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৬ জন গ্রাহককে দাবির টাকা পরিশোধ করেনি জীবন বিমা কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ বিমা দাবির টাকা পাননি ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশ গ্রাহক।

বিমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি পিছিয়ে রয়েছে সমস্যাগ্রস্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটিতে ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়া দাবির ৭০ দশমিক ৩০ শতাংশই এই কোম্পানির।
২০২৫ সাল শেষে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোতে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বিমা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। বছরটিতে গ্রাহকরা বিমা কোম্পানিগুলোতে ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৫ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন করেন। বিপরীতে কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২ জন গ্রাহক ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকার দাবি উত্থান করেন। এর বিপরীতে কোম্পানিটি ৫৮ হাজার ২১৫ জন গ্রাহকের ২১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ কোম্পানিটিতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৭ জন গ্রাহকের ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। বকেয়া পড়ে থাকা দাবির হার ৯৪ শতাংশ।

গ্রাহকদের দাবির টাকা না দেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করেছে ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আইন অনুযায়ী এ খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘন করে কোম্পানিটি অবৈধভাবে ২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।

বিমা দাবি বকেয়া থাকার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটি ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬৭ জন গ্রাহকের ২৬৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা বিমা দাবি পরিশোধ করেনি। বছরটিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২০৭ জন গ্রাহক ২৮০ কোটি ৮১ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি মাত্র ৩ হাজার ৬৪০ জন গ্রাহককে ১১ কোটি ২১ লাখ টাকা দাবি পরিশোধ করেছে।

সমস্যাগ্রস্ত আরেক বিমা কোম্পানি সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৮৪ হাজার ৯৪৩ জন গ্রাহকের ২২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার বিমা দাবি দেয়নি। কোম্পানিটিতে ৮৬ হাজার ৫১১ জন গ্রাহক ২৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫৬৮ জন গ্রাহকের ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রোগ্রেসিভ লাইফে ৪২ হাজার ১৬২ জন গ্রাহকের ১৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিমা দাবি বকেয়া পড়েছে। কোম্পানিটিতে ৫৩ হাজার ৫৯৬ জন গ্রাহক ২০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪৩৪ জন গ্রাহকের ৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করা হয়েছে।

১০০ কোটি টাকার বেশি বিমা দাবি বকেয়া পড়েছে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও। কোম্পানিটিতে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৮ জন গ্রাহক ৯৯৮ কোটি ২ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। এর মধ্যে ১ লাখ ২৪ হাজার ২৪১ জন গ্রাহকের ৮৬৭ কোটি ১ লাখ টাকা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। বিপরীতে ৩৭ হাজার ৮১৭ জন গ্রাহকের ১৩১ কোটি ১ লাখ টাকা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে।

বায়রা লাইফে ৩৩ হাজার ৬১৮ জন গ্রাহক ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি মাত্র ৪৮৭ জন গ্রাহকের ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। কোম্পানিটি ৩৩ হাজার ১৩১ জন গ্রাহকের ৭৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি।

সিংহভাগ বিমা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে গোল্ডেন লাইফেও। কোম্পানিটিতে ২০ হাজার ৫০৩ জন গ্রাহক ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি ২ হাজার ১৭২ জনের ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দিয়েছে। আর ১৮ হাজার ৩৩১ জন গ্রাহকের ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়নি।

হোমল্যান্ড লাইফে ১৫ হাজার ২৪৭ জন গ্রাহক ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা পাচ্ছেন না। কোম্পানিটিতে ১৬ হাজার ৮৭৬ জন গ্রাহক ৪০ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি ১ হাজার ৬২৯ জন গ্রাহকের ৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দিয়েছে।

বড় অঙ্কের বিমা দাবি বকেয়া পড়ে আছে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা কোম্পানি জীবন বীমা কর্পোরেশনেও। কোম্পানিটিতে ৪ হাজার ২৮০ জন গ্রাহকের ৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ জন গ্রাহক ৭৫৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি ১ লাখ ১৬ হাজার ৭০৬ জন গ্রাহকের ৬৯০ কোটি ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।

দেশে ব্যবসা করা একমাত্র বিদেশি কোম্পানি মেটলাইফেও বড় অঙ্কের বিমা দাবি বকেয়া আছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১ হাজার ৭১৮ জন গ্রাহকের ৪৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। এই কোম্পানিটিতে ৩ লাখ ৫ হাজার ৮৪৪ জন গ্রাহক ২ হাজার ৯০২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। বিপরীতে কোম্পানিটিতে ৩ লাখ ৪ হাজার ১২৬ জন গ্রাহকের ২ লাখ ৮৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।

প্রায় অর্ধেক বিমা দাবি বকেয়া পড়েছে সান লাইফ ইন্স্যুরেন্সে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩ জন গ্রাহক ৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থান করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি ১৩ হাজার ১১৫ জন গ্রাহকের ৩৯ কোটি ২২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। আর ১ লাখ ৩ হাজার ৩৪৮ জন গ্রাহকের ৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দাবি বকেয়া রয়েছে।

বাকি কোম্পানিগুলোর বকেয়া দাবির চিত্র: প্রাইম ইসলামী লাইফে ১৪ হাজার ২৫৪ জনের ২৮ কোটি ৭ লাখ টাকা, গার্ডিয়ান লাইফে ৪ হাজার ২৬২ জনের ১৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, ন্যাশনাল লাইফে ১ হাজার ৬৩৮ জনের ১২ কোটি টাকা, প্রগতি লাইফে ৬৮৭ জনের ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, মেঘনা লাইফের ৬২০ জনের ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, পপুলার লাইফে ১ হাজার ২৩৭ জনের ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা, সন্ধানী লাইফে ৩৩৫ জনের ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং ডায়মন্ড লাইফে ৩১৪ জনের ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বিমা দাবি বকেয়া আছে।

বাকি কোম্পানিগুলোতে কোটি টাকার কম দাবি বকেয়া আছে। এর মধ্যে প্রটেক্টিভ লাইফে ১৮৯ জনের ৯৮ লাখ টাকা, আস্থা লাইফে ১০ জনের ১ লাখ টাকা, বেঙ্গল ইসলামী লাইফে ৯ জনের ১২ লাখ টাকা, বেস্ট লাইফে ১২ জনের ১২ লাখ টাকা, চাটার্ড লাইফে ৭ জনের ৩৩ লাখ টাকা, যমুনা লাইফে ২১ জনের ৫১ লাখ টাকা, এনআরবি ইসলামীক লাইফে ৯ জনের ১৬ লাখ টাকা, রূপালী লাইফে ৮৫৪ জনের ৪৩ লাখ টাকা, শান্তা লাইফে ২৭ জনের ৯ লাখ টাকা, স্বদেশ লাইফে ৩ জনের ২৪ লাখ টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফে ৩ জনের ২ লাখ টাকা এবং জেনিথ লাইফে ৪ জনের ৪ লাখ টাকা বিমা দাবি বকেয়া রয়েছে।

পাঁচ কোম্পানির শতভাগ দাবি পরিশোধ: কিছু কোম্পানিতে গ্রাহকদের বিপুল বিমা দাবি বকেয়া পড়লেও পাঁচটি কোম্পানি শতভাগ দাবি পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে আকিজ তাকাফুল লাইফ ৩ হাজার ১০৪ জন গ্রাহককে ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা, আলফা লাইফ ৬ হাজার ৫৩২ জন গ্রাহকের ৪১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ ৯৪৩ জন গ্রাহকের ৯ কোটি ২ লাখ টাকা, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৩ হাজার ৯৪৩ জন গ্রাহকের ১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং সোনালী লাইফ ৫৫ হাজার ৩৩০ জন গ্রাহকের ৪০৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছে।

বিমা কোম্পানিগুলোর সিইওদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং জেনিথ ইসলামী লাইফের সিইও এস এম নুরুজ্জামান বলেন, অল্পকিছু বিমা দাবি বকেয়া থাকতে পারে। কিন্তু প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা দাবি বকেয়া থাকা কিছুতেই স্বাভাবিক না। এটা হয়েছে মূলত গুটিকয়েক কোম্পানির কারণে। হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানিতেই অধিকাংশ বিমা দাবি বকেয়া রয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর কারণে এখন পুরো বিমা খাতকে ভুক্ত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের সোশ্যাল মিডিয়া আইকনে ক্লিক করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2025 Businessprotidin.com
Site Customized By NewsTech.Com