নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতে ২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ যাচাই-বাছাই শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত বিতরণ হওয়া বড় ঋণগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব ঋণ প্রকৃত নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে, নাকি আগের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই সীমাবদ্ধ থাকছে, তা যাচাই করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নির্দেশে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ২২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর আগের বছরের জুন শেষে বড় ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে ছয় মাসে বড় ঋণ বেড়েছে ৪২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় ঋণ বিতরণে অনিয়ম হয়েছে কি না, পুরোনো গ্রাহকেরাই বারবার ঋণ সুবিধা পাচ্ছে কি না এবং নতুন উদ্যোক্তারা সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। পর্যালোচনা শেষে গভর্নরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, ২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ নতুন করে যাচাই করা হবে। এসব ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এতে অন্তত ২৮টি ব্যাংক আর্থিক সংকটে পড়ে।
বর্তমানে পাচার হওয়া অর্থ ও বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানে কাজ করছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের জন্য একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে।
যেসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে আছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ ও নাসা গ্রুপ। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, নামে-বেনামে ঋণ নেওয়া এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বাধীন এ টাস্কফোর্সে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
পরে শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সদস্য হিসেবে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্তাধীন ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, প্রিমিয়ার, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, জেমকন, নাসা, বসুন্ধরা, সিকদার ও আরামিট গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মালিকদের ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে দুদক। দেশে ও বিদেশে থাকা বিভিন্ন সম্পদ জব্দের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের তথ্যের ভিত্তিতে ছয়টি গ্রুপকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশই এই ছয় গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
Leave a Reply