বাণিজ্য ডেস্ক: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর আলোচনা সফল হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে হামলার ঘটনায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বুধবার (১২ আগস্ট) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
অক্টোবরে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৬১ ডলারে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এ দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে তেলের বাজারে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিডনিভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটেরার বলেন, বাজার এখনো চুক্তির বিষয়ে পুরোপুরি আশা হারায়নি। তবে আলোচনা যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং দাবিগুলো যত জটিল হচ্ছে, দ্রুত কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়ও তত বাড়ছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
মঙ্গলবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কাতার দ্রুত এই জলপথ খুলে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে ইরান বলছে, ওমানের সঙ্গে তাদের আলোচনা সরাসরি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং অবরোধ প্রত্যাহারের মতো নির্দিষ্ট শর্তে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে বাস্তবে যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার মাত্র ১০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত।
এ পরিস্থিতিতে তেলের বাজার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানিয়েছে, ২০২৭ সালের শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি ফেরার সম্ভাবনা কম। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৭ ডলার হতে পারে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক জুন গোহের মতে, হরমুজ প্রণালির উভয় দিকে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওপেকের পক্ষ থেকে তেল উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা সীমিত থাকবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
Leave a Reply