আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের: যেকোন খাতে সচেতনা তৈরিতে প্রচুর প্রচার ও প্রসার একান্ত প্রয়োজন। আমাদের দেশের মানুষ বীমা সচেতন নয়, এমন অভিযোগ আমরা শুনে থাকি। কিন্তু কেন তারা সচেতন নয় এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা, পর্যালোচনা খুব কম লক্ষ্য করা যায়। বীমা ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ বীমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কম-বেশি জানা শোনা আছে। কিন্তু বীমা ব্যবস্থার আওতায় সকল নাগরিককে আমরা সম্পৃক্ত করতে পারিনি। এ ব্যর্থতা মূলত দেশের বীমাবিদদের ও বীমা ব্যবসায়ীদের। বীমা পেশার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকবদ্ধ প্রয়াস বীমা শিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে এবং এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
বীমা শিল্পের বিকাশে মৌলিক বাধা সমূহ কি কি তা অবশ্যই প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে। প্রধান প্রধান বাধা দূর করার জন্য নীতি নির্ধারক তথা সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বীমাবিদ, বীমা ব্যবসায়ী, বীমা কর্মী, সংবাদিক ও বীমা গ্রাহকের সমঝোতা ও সম্মলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
আমাদের জাতীয় বীমা নীতিতে বীমার উপকারিতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে বাংলাদেশে বীমা অনগ্রসরতার একটি প্রধান কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়াও অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির প্রয়োগহীনতা, দক্ষ নেতৃত্বের অভাবকে বাংলাদেশের বীমা শিল্পের অনগ্রসরতার অন্যান্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট বীমাবিদগণ।
বীমা সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারকেই প্রথমে দৃষ্টি দিতে হবে, কেননা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া মূলতঃ সরকারের কাজ। ঠিক একইভাবে সমাজের দুস্থ্য, অসহায়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব।
বীমা ব্যবস্থা যেহেতু মানুষের অসহায় অবস্থার একটি রক্ষাকবচ, সেহেতু বীমা ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সরকার তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য সরকার একটি “জাতীয় বীমা নীতি” প্রনয়ন করেছে। বীমা নীতির অংশ হিসেবে সকল শ্রেণীর মানুষকে বীমা ব্যবস্থার সুফল সম্পর্কে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বীমা কোম্পানিকে দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হলে বীমা প্রতিষ্ঠান সমূহের সার্বিক উন্নয়ন প্রয়োজন।
শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষুদ্রবীমার প্রসারে শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে ওয়ার্কম্যানস কমপেনসেশন অ্যাক্ট-এর অধীনে কারখানা মালিকদের জন্য বাধ্যতামূলক দায় বীমা বা গোষ্ঠী জীবন, স্বাস্থ্য ও দূর্ঘটনা বীমা চালু করা যেতে পারে। প্রবাসীদের কল্যণে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সামাজিক সংস্থা এবং এনজিও’দের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে এবং ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদেরকে বীমার আওতায় নিয়ে আনার জন্য সচেতনতা ও উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালেয়ের কর্মসূচী থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য বীমা চালু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যখাতে ভূমিকা রাখতে পারে এবং সোশ্যাল হেলথ ইন্সুরেন্স বা সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়াও কৃষি বীমা ও পশু সম্পদ বীমার সঠিক বাস্তবায়নের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৃষক, ক্ষুদ্য ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের সচেতন করা যেতে পারে।
গণ-মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রধান কাজটি করতে হবে সরকারকে। এজন্য বীমা ব্যবসায় নিয়োজিত উদ্যোক্তা শ্রেণী, বীমা পেশাজীবী/ বীমাবিদ, শিক্ষাবিদ, বীমাগ্রাহক, অর্থনীতিবিদসহ সকল মহল থেকে এ ব্যাপারে পরামর্শ পেশ করতে হবে।
বীমা পেশাজীবীদের সংগঠন এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যদি এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তবে জাতীয় বীমা নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব। “বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০” এ বীমা কর্তৃপক্ষের কার্যবলী ও দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম একটি দায়িত্ব হচ্ছে বীমা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেমিনার, ওয়ার্কশপ, সভা ইত্যদির আয়োজন করা। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামও এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী।
এ ছাড়াও দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা বিষয়ক পাঠ্যক্রম যথা “ঝুঁকি বিজ্ঞান”, “ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা”, “এ্যাকচুয়ারী” সহ জীবন বীমা, স্বাস্থ্যবীমা, সম্পত্তি বীমা, মোটর বীমা, কারিগরী বীমা, দায় বীমা বিষয়ক কোর্স সমূহ চালু করা প্রয়োজন।
বীমা প্রতিষ্ঠান সমুহে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। বীমা প্রতিষ্ঠান সমুহ থেকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জন সম্পদের জন্য চাহিদা সৃষ্টি করা না হলে উপযুক্ত জনবল সৃষ্টি বা সরবরাহ ফলপ্রসূ হবে না।
Leave a Reply