দেশের সম্ভাবনাময় বীমা খাত বর্তমানে নানান সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে। নানামুখি সমস্যায় জর্জরিত এই খাতের প্রসার ঘটছে না। শত প্রতিকূলতা, করোনা মহামারির প্রভাব, অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ২০২০ সালের ২২ জুন বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন মো. কাজিম উদ্দিন।
পরিশ্রম, মেধা আর সততার প্রমাণ দিয়ে দক্ষ নেতৃত্ব একটা কোম্পানিকে সফলতার শিখরে তুলে নিতে পারে তা প্রমাণ করেছেন তিনি। ১৯৮৭ সালে বীমা কোম্পানিতে এজেন্ট হিসেবে যোগদান করে সুদীর্ঘ ৩৬ বছর ন্যাশনাল লাইফের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের অসাধারণ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখনও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি। সফলতার ধারাবাহিকতায় সব সূচকে দেশের শীর্ষতম কোম্পানিতে পরিণত হওয়ায়, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে সিইওর দায়িত্ব দিয়েছেন। ন্যাশনাল লাইফের বর্তমান অবস্থা এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে বিজনেস প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন মো. কাজিম উদ্দিন।সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিজনেস প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার আবরার ফাহাদ।
বিজনেন প্রতিদিন: ন্যাশনাল লাইফের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?
মো. কাজিম উদ্দিন : বর্তমানে বীমা খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা কোম্পানিগুলো বীমা দাবি পরিশোধে হিমসীম খাচ্ছে। এই দিক থেকে ন্যাশনাল লাইফ কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় ও গ্রাহকের দাবি পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখছে। সেজন্য গত ৩৯ বছর ধরে লাইফ ফান্ডের টাকা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অতীতে কখনও আমাদের আর্থিক সংকট দেখা দেয়নি। প্রতি বছরে লাইফ ফান্ড উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জন্য ন্যাশনাল লাইফ শক্ত আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। আমরা এই সফলতা ধরে রাখতে চাই এবং আরও বেশি গ্রাহকের আস্তা অর্জনে কাজ করতে চাই। যাতে করে বীমা খাতে গ্রাহকদের বিশ্বাসের জায়গা হয় ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।

কমনওয়েলথ পার্টনারশিপ সামিট অ্যান্ড বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৩ পুরস্কার হাতে ন্যাশনাল লাইফের সিইও মোঃ কাজিম উদ্দিন।
আমাদের কোম্পানির লাইফ ফান্ডের ৯৫ শতাংশই সরকারি ট্রেজারি বন্ডে ৩৮ শতাংশ এছাড়াও বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা আছে। লাইফ ফান্ড সংরক্ষেলের পাশাপাশি যথাসময়ে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করা হচ্ছে। ২০২২ সালে ১০৫১ কোটি টাকা দাবি পরিশোধ করায় ২০২৩ সালে জাতীয় বীমা দিবসে সরকার ন্যাশনাল লাইফকে জাতীয় পুরস্কার প্রদান করে। আমাদের কোম্পানি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বলতে গেলে বলবো, আমাদের ২০২৩ সাল শেষে ন্যাশনাল লাইফের বিক্রিত বীমা পলিসির সংখ্যা হয়েছে ৬৪ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩০টি। সর্বমোট প্রিমিয়াম অর্জিত হয়েছে ১৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। আমাদের লাইফ ফান্ড ২০২৩ সালে ৫০১ কোটি টাকা যুক্ত হয়ে এখন ৫ হাজার ৩০১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা বীমা খাতে অনন্য দৃষ্টান্ত বলে মনে করছি।যার একটি টাকাতেও আমাদের হাত দিতে হয়নি। আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে ৫ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা এবং মোট সম্পদ ৬ হাজার ৪১ কোটি টাকা। তাছাড়া বিদায়ী বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ন্যাশনাল লাইফের সর্বমোট বীমা দাবি পরিশোধ করা হয় ৯ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।
বিজনেস প্রতিদিন: বাংলাদেশের মানুষ বীমা করতে এত অনাগ্রহী কেন?
মো. কাজিম উদ্দিন : অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের বীমা খাত পিছিয়ে থাকার বড় কারণ গ্রাহকের আস্থা ও সচেতনতার অভাব। এজন্য সাধারণ মানুষ বীমা পলিসি গ্রহণে অনাগ্রহী।আমরা যদি লক্ষ্য করি দেখতে পাবো আমাদের দেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমার অবদান মাত্র ০.৪৫ শতাংশ। উন্নত বিশ্বে এই হার শতভাগের কাছাকাছি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জিডিপিতেও বীমার অবদান ৪ দশমিক ২ শতাংশ। নেপাল, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশেও এ হার বেশ সন্তোষজনক। কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়েও বাংলাদেশে বীমা গ্রাহকের হার অনেক কম।আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ বীমার আওতায় এসেছে।সাধারণ মানুষ বীমা পলিসি গ্রহণে অনাগ্রহী হওয়ার অন্যতম কারণ বীমার উপকারিতা সম্পর্কে না জানা।এছাড়াও বীমা নিয়ে নানা নেতিবাচক অপপ্রচার এই খাতকে পিছিয়ে রেখেছে।
তবে আশার বিষয় হলো, সরকার ও আইডিআরএ’র নানামুখী পদক্ষেপের ফলে বীমার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বীমা আইন ২০১০ এবং জাতীয় বীমানীতি ২০১৪ প্রণণয়ন, বীমা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সারা দেশে জাতীয় বীমা দিবস পালনের মাধ্যমে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে। তবে বীমার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে হলে বীমা কোম্পানিগুলোকে গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধি ও সময়মত বীমা দাবী পরিশোধ করতে হবে।
বিজনেস প্রতিদিন: ব্যাংকাস্যুরেন্সের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন হবে বলে মনে করছেন?
মো. কাজিম উদ্দিন : আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে আরও তিন যুগ আগে ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হয়েছে। সে দৃষ্টিকোন থেকে বাংলাদেশে ব্যাংকাস্যুরেন্স অনেক দেরিতে চালু হলেও এর অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।আমাদের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে বীমা জনগণের কাছে আরও সহজলভ্য হবে ও জনগণের আর্থিক নিরাপত্তা সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।

বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অফ দ্যা ইয়ার হিসেবে প্রেস্টিজ অ্যাওয়ার্ড-২০২৩ অর্জন করেছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমাদের পাশের দেশ ভারতে ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে বীমা গ্রহণের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং এজেন্সি ও অন্যান্য চ্যানেলের মাধ্যমে বীমা গ্রহণের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। শুধুমাত্র ভারতের এসবিআই লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০২২ সালের তাদের অর্জিত মোট প্রিমিয়াম ২৯,৫৯০ কোটি রুপির মধ্যে ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে আয় করেছে ১৭,৮৩০ কোটি রুপি, যা তাদের মোট প্রিমিয়ামের ৬০ শতাংশ।
আমরাও সার্বিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকাস্যুরেন্সকে এগিয়ে নিতে পারলে আমাদেরও বিপুল প্রিমিয়াম আয় সম্ভব হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। আমাদের পাশের দেশ ভারতের মতই সফলতা পাবে ব্যাংকাস্যুরেন্স সেই প্রত্যাশায় কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই সফলতা আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
বিজনেস প্রতিদিন: বর্তমানে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কী বাড়ছে?
মো. কাজিম উদ্দিন : আমরা প্রথমে যখন বীমা খাতে কাজ শুরু করেছি তখন বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম আদায় করতো হাতে লেখা রশিদ দিয়ে। এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহক সেবায় জটিলতা হতো। অনেক গ্রাহক এজেন্টদের ধারা প্রতারণার শিকারও হতেন। তবে বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতির কারণে সময় বদলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমও ডিজিটাল হচ্ছে। এখন প্রিমিয়াম আদায়ে ডিজিটাল রশিদ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ গ্রাহক প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মুঠোফোনে এসএমএস চলে যাচ্ছে। আইডিআরএও এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের পলিসির তথ্য দিচ্ছে। এতে গ্রাহক তার প্রিমিয়াম জমা হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে।যে কারণে গ্রাহকের প্রিমিয়াম জমার জটিলতা বা অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা পাচ্ছে। ফলে অনাস্থা দূর হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বাসও বাড়ছে।
বিজনেস প্রতিদিন : ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বিমা’ নিয়ে ন্যাশনাল লাইফ কেমন সাড়া পেয়েছে?
মো. কাজিম উদ্দিন : ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বিমা’ চালু এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। ৩ থেকে ১৭ বছর বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্য অভিভাবকরা বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বিমা করতে পারবেন। এজন্য বার্ষিক প্রিমিয়াম দিতে হবে সর্বনিন্ম ৮৫ টাকা। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বিমা পলিসি গ্রহণের পর কোনো কারণে অভিভাবক মারা গেলে ওই শিশু ১৭ বছর পর্যন্ত মাসিক ৫০০ টাকা করে পাবে। এছাড়া ১৭০ টাকা প্রিমিয়াম দিলে মাসে ১০০০ টাকা, ২৫৫ টাকা প্রিমিয়াম দিলে ১৫০০ টাকা, ৩৪০ টাকা প্রিমিয়াম দিলে ২০০০ টাকা, ৪২৫ টাকা প্রিমিয়াম দিলে ২৫০০ টাকা মাসে পাবে।
২০২৩ সালে ৩৫টি লাইফ বিমা কোম্পানি ৮০ হাজার বিমা করেছে, সেখানে ন্যাশনাল লাইফ একাই ৭৭ হাজার বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বিমা করিয়েছে। তাই বলতে পারি বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বিমায় আমরা দারুণ সাড়া পেয়েছি।

শ্রেষ্ঠ জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘আরটিভি বীমা অ্যায়ার্ড-২০২২’ লাভ করেছে ন্যাশনাল লাইফ।
বিজনেস প্রতিদিন: বিভিন্ন সফলতায় আপনার পুরস্কার প্রাপ্তির অনূভুতি কেমন যদি বলতেন?
মো. কাজিম উদ্দিন : কোন কাজের স্বীকৃতি পাওয়া খুবই আনন্দের বিষয়। এই আনন্দ শুধু আমার নয় পুরো ন্যাশনাল লাইফ পরিবারের আনন্দ। বিগত দিনে ন্যাশনাল লাইফের হয়ে যতগুলো পুরস্কার পেয়েছি সব আমার কর্মী এবং কর্মকর্তাদের কাজের সফলতায় পেয়েছি। ন্যাশনাল লাইফ একটি পরিবার এই পরিবারের প্রতিটি সফলতা আমাদের সবার অবদান অনস্বীকার্য। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের টার্গেট গ্রাহককে সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে সেবা দেওয়া। আমাদের ভালো সেবাই আমাদের সফলতার চুড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি হবে বীমা গ্রাহকদের আস্তার জায়গা।
বিজনেস প্রতিদিন : বীমা দাবী পরিশোধে আপনার মূল্যায়ন কী?
মো. কাজিম উদ্দিন : বীমা দাবি পরিশোধে শুধু যে গ্রাহক লাভবান হবেন তা নয়, এতে পুরো বীমা খাত লাভবান হয়। সঠিক সময়ে বীমা দাবি পরিশোধ করা হলে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আস্থা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে মেয়াদ পূর্তির পরই দ্রুত বীমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। পদ্ধতিগত কার্যক্রমের নামে সময়ক্ষেপন না করে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি করতে হবে। দাবির চেক প্রদানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা গেলে বীমা নিয়ে নেতিবাচক ধারনা দূর হয়ে নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হবে; যা নতুন গ্রাহক সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে একজনের বীমা দাবি পরিশোধ করলে ১০ জন নতুন গ্রাহক সৃষ্টি হবে।
Leave a Reply