দেশের সম্ভাবনাময় বীমা খাত বর্তমানে নানান সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে। নানামুখি সমস্যায় জর্জরিত এই খাতের প্রসার ঘটছে না। শত প্রতিকূলতা, করোনা মহামারির প্রভাব, অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও প্রতিনিয়ত ভালো ব্যবসার পাশাপাশি লাইফ ফান্ডেও চমক দেখিয়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। যার আকার বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানির বড় অংকের এই লাইফ ফান্ডের টাকা কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ হয় এবং বিনিয়োগ থেকে কেমন লভ্যাংশ আসে ইত্যাদিসহ নানান বিষয়ে বিজনেস প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস কে মারুফুল হক।
বিজনেস প্রতিদিন: লাইফ ফান্ড বীমা কোম্পানির জন্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?
এস কে মারুফুল হক: বীমা কোম্পানির মূল প্রাণ শক্তি হলো লাইফ ফান্ড। যে কোম্পানির লাইফ ফান্ড বড় সে কোম্পানি তত শক্তিশালী বা সমৃদ্ধ। সেই জায়গা থেকে ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স অনেক গোছানো এবং সমৃদ্ধ। আমাদের লাইফ ফান্ড গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের কোম্পানি যে ফর্মূলায় চলছে তা খুবই সুশৃঙ্খল এবং ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই এগোচ্ছে। আমাদের লাইফ ফান্ড নিরাপদ জায়গায় বিনিয়োগ হচ্ছে পাশাপাশি আমাদের ব্যবসার ধারাবাহিকতাও বাড়ছে। যার ফলে আমরা পিছনে তাকাতে হচ্ছে না। ব্যবসার সাফল্য বা ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষার ফলে প্রতিবছরই আমাদের লাইফ ফান্ডের আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের লাইফ ফান্ডের আকার প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। আমাদের বিনিয়োগও প্রায় সমপরিমান। সব মিলে আমাদের লাইফ ফান্ড থেকে প্রতি বছর ৮-৯ শতাংশ লভ্যাংশ আসে।
বিজনেস প্রতিদিন: বীমা খাতে ব্যবসা করা এবং লাইফ ফান্ডের টাকা বিনিয়োগ করার গুরুত্ব সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?
এস কে মারুফুল হক: বীমা কোম্পানিতে প্রিমিয়াম আনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনিভাবে লাইফ ফান্ডের টাকা বিনিয়োগ করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ধারণা হয়তো কোম্পানি প্রিমিয়াম আনলেই কোম্পানি বড় হয়। আমি বলবো শুধু প্রিমিয়াম অর্জন হলেই কোম্পানি শক্তিশালী হয় না বরং অর্জিত টাকা সঠিকভাবে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে কোম্পানির ভীত শক্ত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কোন জায়গায় কোম্পানি বিনিয়োগ করতেছে। যেখানে সেখানে বা অনিরাপদ জায়গায় বিনিয়োগ করলে কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার প্রভাব পুরো কোম্পানির উপর পড়ে। আবার নিরাপদ এবং লাভবান জায়গায় বিনিয়োগ হলে কোম্পানি শক্তিশালী হয়। এমন জায়গায় কোম্পানির টাকা বিনিয়োগ করা যাবে না, যেখান থেকে রিটার্ন আসবে না। আর রিটার্ন না আসলে কোম্পানি গ্রাহককে টাকা দিতে পারবে না, লভ্যাংশ দিতে পারবে না ইত্যাদি। সেজন্য লাইফ ফান্ডটাকে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিজনেস প্রতিদিন: লাইফ ফান্ডের টাকা বিনিয়োগে আইডিআরএ’র কি ধরণের দিকনির্দেশনা রয়েছে?
এস কে মারুফুল হক: বীমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইডিআরএ’র কিছু গাইডলাইন আছে। ন্যাশনাল লাইফ সেই গাইডলাইনের সবটুকু ফলে করেই বিনিয়োগ করে থাকে। সে দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ন্যাশনাল লাইফের টাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে থাকে। আমাদের বিনিয়োগের জায়গা হলো এফডিআর, ট্রেজারি বন্ড, অন্যান্য বন্ড, ডিবেঞ্চার এবং শেয়ারবাজার। এসব জায়গায় আমরা কতটুকু বিনিয়োগ করতে পারবো তা গাইডলাইট অনুযায়ি করে থাকি। আমাদের টার্গেট থাকে ভালো জায়গায় বিনিয়োগ করা যাতে বেশি রিটার্ন পেয়ে গ্রাহককে সঠিকভাবে টাকা দিতে পারি। এছাড়াও আমাদের লাইফ ফান্ড নিরাপদ থাকবে। যদি মনে করেন আমি খারাপ বা দুর্বল একটা ব্যাংকে কিংবা খারাপ শেয়ারে বিনিয়োগ করলাম এতে রিটার্ন আসবে না ফলে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত, আমাদের কোম্পানিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য বিনিয়োগ নিরাপদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সেটা মাথায় রেখেই বিভিন্ন নিরাপদ এবং বেশি রিটার্ন দেয় এমন জায়গায় বিনিয়োগ করি।
বিজনেস প্রতিদিন: ন্যাশনাল লাইফের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার লাইফ ফান্ড, এর রক্ষণাবেক্ষণ যথার্থভাবে হচ্ছে কি?
এস কে মারুফুল হক: ন্যাশনাল লাইফের বিনিয়োগের টাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। আমরা বিনিয়োগের জায়গা নিরাপদ মনে হলেই শুধু বিনিয়োগ করি। এখন আমাদের বিনিয়োগের ৫০ শতাংশ রয়েছে সরকারি ট্রেজারি বন্ডে। যা সম্পূর্ণ নিরাপদ জায়গা। যার রিটার্ন প্রায় ১২-১৩ শতাংশ। যা অন্য জায়গায় বিনিয়োগ থেকে অনেক ভালো রিটার্ন দেয়। সবচেয়ে ভালো দিক হলো প্রতি ৬ মাস পর পর আমরা এই বিনিয়োগের রিটার্ন পেয়ে যাই। যার ফলে আমাদের নগদ টাকার সমস্যায় পড়তে হয় না। অনেকে টাকার অভাবে গ্রাহকের প্রাপ্য দিতে পারছে না। কিন্তু আমাদের বিনিয়োগ থেকে সময়মত আমরা রিটার্ন পাচ্ছি এবং গ্রাহককেও তার প্রাপ্য দিতে পারছি। যার কারণে আমাদের কোম্পানিতে কোন শঙ্কার কারণ নেই। আমাদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. কাজিম উদ্দিনের দক্ষ নেতৃত্বে একদিকে আমরা বিনিয়োগে ভালো রিটার্ন পাচ্ছি অন্যদিকে কোম্পানির চলমান ব্যবসাও ভালো হচ্ছে। যার ফলে আমরা উভয় দিক থেকে লাভবান হচ্ছি এবং দিন দিন কোম্পানি সমৃদ্ধ হচ্ছে। দুইটা বিষয়ের সমন্বয়ে ন্যাশনাল লাইফ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের গ্রাহকদের বলবো ন্যাশনাল লাইফের সব কিছু সঠিক নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, এজন্য কোন ভয়ের কারণ নেই। আমরা সবসময় সঠিক চিন্তা করে সব কাজ করছি এবং সামনেও করবো। যার ফলাফল কোম্পানির ব্যবসায় সমৃদ্ধি ক্রমেই বাড়ছে। করোনা মহামারির কঠিন সময়েও আমরা অনেক ভালো ব্যবসা করেছি যা এই খাতের জন্য রেকর্ড।
বিজনেস প্রতিদিন: ট্রেজারি বন্ডে ৫০ শতাংশ ছাড়া আর কোথায় আপনাদের বিনিয়োগ আছে?
এস কে মারুফুল হক: ট্রেজারি বন্ড ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে আমাদের এফডিআর এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ আছে। তবে বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ বিদায় আমরা শেয়ারবাজারে খুব কম বিনিয়োগ করেছি। পরবর্তীতে বাজারে অবস্থা ভালো হলে তা আরও বাড়বে। এছাড়াও জিরো কুপন বন্ড, সাব অর্ডিনেট বন্ড ও ডিবেঞ্চারেও আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। আমরা দেখে দেখে যেখান থেকে ভালো রিটার্ন আসবে সেখানেই আমরা বিনিয়োগ করি। এসব বিনিয়োগ আমরা আইডিআরএ’র নিয়ম বা ইনভেস্টমেন্ট গাইডলাইন মেনেই করে থাকি। আইডিআরএ যত শতাংশ নির্দেশনা দিয়েছে তার কম নয় বরং বেশি বিনিয়োগ করে থাকি। কেননা সর্বোচ্চ বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোন বাধা নেই। তাই আমাদের সুবিধা মতো বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করে থাকি।
তিনি বলেন, এসব বিনিয়োগের বাইরেও ন্যাশনাল লাইফের রিয়েলস্টেট খাতে বিনিয়োগ আছে। কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের ভবনটা আমাদের কোম্পানির নিজস্ব। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় আমাদের নিজস্ব ভবন রয়েছে, যেখানে আমাদের শাখা অফিস আছে। এসব অফিস ভাড়া আমাদের দিতে হচ্ছে না নিজেদের সম্পদ হওয়ায়। ঢাকা বা ঢাকার বাহিরেও আমাদের ফ্লাট বা ভবন আছে যার ফলে ন্যাশনাল লাইফের ভীত আরও শক্ত হয়েছে । কারণ আমরা নিজেদের জায়গায় অফিস করায় ভাড়া দিতে হচ্ছে না। এটা কোম্পানির স্থায়ী সম্পদ হিসেবে থাকছে।
বিজনেস প্রতিদিন: ন্যাশনাল লাইফ শরীয়াহ ভিত্তিক বিনিয়োগ করে কিনা?
এস কে মারুফুল হক: ন্যাশনাল লাইফ সাধারণত ট্রেডিশনাল ব্যবসা করে থাকে। এর বাইরেও আমাদের কোম্পানির ইসলামী তাকাফুলের ব্যবসা আছে। আমরা যেহেতু মুসলিম দেশের জনগণ সেক্ষেত্রে আমাদের শরীয়াহ ভিত্তিক প্রোডাক্ট থাকা দরকার। সেজন্য আমাদের ইসলামী তাকাফুল শাখা আছে। ইসলামী তাকাফুল থেকে আমরা যে টাকাগুলো পেয়ে থাকি তা ইসলামী ব্যাংক বা ইসলামী বন্ডগুলোতে বিনিয়োগ করে থাকি। এখানে দুইটা একত্র হওয়ার সুযোগ নেই। শরীয়াহ তাকাফুলের জন্য ভিন্ন বোর্ড আছে ভিন্ন অ্যাকাউন্ট আছে সেখানেই লেনদেন হয়। সেখানে শরীয়াহ বোর্ডে আইডিআরএ’র গাইডলাইন মেনেই সব কাজ সম্পন্ন করে।
Leave a Reply