বিশেষ প্রতিনিধি: দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি রানার অটোমোবাইলস পিএলসির বিক্রিতে হঠাৎ অস্বাভাবিক উল্লম্ফন। গত দুই বছর লোকসানে থাকা কোম্পানিটি জানুয়ারি-মার্চ,২৫ সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক সেলস দেখিয়ে অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে কোম্পানি আগের বছরের তুলনায় বিক্রি ১৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা কোম্পানিটির বিগত দিনের পারফরম্যান্স অনুযায়ী খুবই অস্বাভাবিক। যা ‘আলাদিনের চেরাগ’-এর ছোঁয়ায় সম্ভব বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রানারের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৫) সেলস হয়েছে ১৬৬ কোটি ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯৬ টাকা। যা আগের ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৪) সেলস ছিল মাত্র ৭০ কোটি ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৭ টাকা। অর্থাৎ বছর ঘুরতেই বিক্রি হঠাৎ করেই বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ।
অবাক করা বিষয় হলো আলোচিত সময়ে সেলস ৯৫ কোটি ৮৬ লাখ ৭১ হাজার ২১৯ টাকা বা ১৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বিক্রি এবং বিতরণ ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৪ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ১৫৩ টাকা। অথচ এর আগে ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৪) ৭০ কোটি ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৭ টাকা সেলস করতে বিক্রি এবং বিতরণ ব্যয় হয়েছিল ১০ কোটি ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৬১৫ টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০১৯-২০ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২০) রানার অটোমোবাইলসের সেলস হয়েছিল ৮১ কোটি ১৪ লাখ ২৫ হাজার ২০৬ টাকা, ২০২০-২১ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২১) সেলস হয়েছিল ৯৬ কোটি ৩৮ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৩ টাকা, ২০২১-২২ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২২) সেলস হয়েছিল ৯৩ কোটি ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৪ টাকা, ২০২২-২৩ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৩) সেলস হয়েছিল ৭২ কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার ৩৫৯ টাকা। তালিকাভুক্তির পর থেকে কোম্পানিটিকে যেখানে লোকসানে বেশি দেখা গেছে, সেখানে হঠাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ১৬৬ কোটি টাকা সেলস দেখানোটা গোঁজামিল এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। তাই এতো অল্প সময়ে এতো বড় ব্যবধানের সেলস অস্বাভাবিক বলছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া রানার অটোমোবাইলস যেভাবে আওয়াজ তুলে বাজারে এসেছে, তা কোম্পানি ধরে রাখতে পারেনি। দেশি কোম্পানি হিসেবে তাদের যে সুযোগ ছিল তা তারা কাজে লাগাতে পারেনি। ম্যানেজমেন্টের অস্বচ্ছতা, উদাসিনতা, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে কোম্পানিটির আজ বেহাল দশা।
অস্বাভাবিক বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে রানারের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সনাৎ দত্ত বিজনেস প্রতিদিনকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বেশি বিক্রির কারণ থ্রি-হুইলার (থ্রি ডব্লিউ) বিভাগে বিক্রয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। আর এটা সম্ভব হয়েছে মূলত উন্নত বাজার চাহিদা এবং কোম্পানির গৃহীত কৌশলগত ব্যবসায়িক উদ্যোগ। এই সময়ে কোম্পানি তার বাজার প্রসার জোরদার করতে ডিলার নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করেছে।
বিক্রি ও বিতরণ ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম হওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, তৃতীয় প্রান্তিকে বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয় ছিল ১৫.০৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ৪.৯৭ কোটি টাকার পার্থক্য। বিক্রয়ে ১৩৬% বৃদ্ধি সত্ত্বেও বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয় কম কারণ থ্রি-হুইলার বিক্রিতে আমাদের কষ্ট অনেক কম হয়েছে। আমাদের ব্যয়-দক্ষতা কৌশলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, আমরা আমাদের বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করি।
এদিকে, ২০২৩ সালে থ্রি- হুইলার অটোরিকশা বাজারজাত শুরু করে রানার অটোমোবাইলস। সেই বছর রানার লোকসান করে। এমনকি ২০২৪ সালেও লোকসান করে কোম্পানিটি। ২৩ ও ২৪ দুই বছর বিক্রি বৃদ্ধিতে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা কোন অবদান রাখতে পারেনি। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে থ্রি-হুইলার বিক্রি চমক দেখিয়ে ধোয়াশা তৈরি করেছে কোম্পানিটি।
এএইচ/পিএস
Leave a Reply