মোহাম্মদ জহির উদ্দিন: জীবন বীমা এমন একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যার প্রকৃত সাফল্য নতুন পলিসি বিক্রিতে নয়; বরং বছরের পর বছর পলিসি সচল থাকার মধ্যেই নিহিত। কিন্তু বাংলাদেশের জীবন বীমা খাত আজ একটি নীরব অথচ গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে নতুন পলিসি বিক্রি ও প্রিমিয়াম আয় বাড়ছে, অন্যদিকে প্রতিবছর লাখো পলিসি ল্যাপস (তামাদি) হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহক, দুর্বল হচ্ছে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভিত্তি এবং কমছে পুরো শিল্পের প্রতি মানুষের আস্থা।
সাধারণ ধারণা, আর্থিক সংকটের কারণেই পলিসি ল্যাপস হয়। বাস্তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়। একচুয়ারিয়াল দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, পণ্যের উপযোগিতা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা, বিক্রয়-পরবর্তী সেবা এবং সুশাসন—সব মিলিয়েই ল্যাপসের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই অর্থনৈতিক পরিবেশে সব কোম্পানির ল্যাপসের হার সমান নয়, যা ইঙ্গিত করে সমস্যার শিকড় আরও গভীরে।
আন্তর্জাতিক জীবন বীমা গবেষণায় তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়—গ্রাহক দীর্ঘমেয়াদে প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে পারবেন কি না, তিনি পলিসির প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করেন কি না এবং কোম্পানির প্রতি তাঁর আস্থা বজায় থাকে কি না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য ঘাটতির লক্ষণ দেখা যায়।
আইডিআরএর প্রকাশিত তথ্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং বাজার বাস্তবতার আলোকে লেখকের বিশ্লেষণে পাঁচটি কাঠামোগত ঘাটতি (Structural Gaps) এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
১. Affordability Gap (আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি): অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই পলিসি বিক্রি করা হয়। ফলে কয়েক বছর পর নিয়মিত প্রিমিয়াম বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং পলিসি ল্যাপস হয়।
২. Trust Gap (আস্থার ঘাটতি): জীবন বীমা মূলত বিশ্বাসের ব্যবসা। দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, দুর্বল গ্রাহকসেবা কিংবা সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু বিদ্যমান গ্রাহকের ওপর নয়, সম্ভাব্য নতুন গ্রাহকদের সিদ্ধান্তেও পড়ে।
৩. Persistency Gap (পলিসি সচল রাখার ঘাটতি): উন্নত জীবন বীমা বাজারে Policy Persistency Rate অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতা সূচক। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন ব্যবসা অর্জনের ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়; বিদ্যমান গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার কৌশল ততটা শক্তিশালী নয়।
৪. Service Gap (গ্রাহকসেবার ঘাটতি): পলিসি বিক্রির পর নিয়মিত যোগাযোগ, প্রিমিয়াম পরিশোধের স্মরণ করিয়ে দেওয়া, বার্ষিক পলিসি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের ঘাটতির কারণে অনেক গ্রাহক সাময়িক সমস্যার সমাধান না খুঁজে প্রিমিয়াম বন্ধ করে দেন, যা শেষ পর্যন্ত পলিসি ল্যাপসে পরিণত হয়।
৫. Governance & Data Gap (সুশাসন ও তথ্যব্যবস্থাপনার ঘাটতি): আধুনিক জীবন বীমা শিল্প সম্পূর্ণ তথ্যনির্ভর। উন্নত দেশগুলো ডেটা অ্যানালিটিক্স, একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকের আচরণগত তথ্য ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ পলিসি আগেই শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে এ ধরনের তথ্যভিত্তিক গ্রাহক ব্যবস্থাপনা এখনও পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, জীবন বীমা পলিসি ল্যাপস কোনো একক কারণে হয় না। এটি গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, আস্থা, পলিসি সচল রাখার কৌশল, গ্রাহকসেবা, তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের সম্মিলিত দুর্বলতার প্রতিফলন।
কী করা দরকার
-গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য ও প্রিমিয়াম নির্ধারণ। Policy Persistency Rate-কে প্রতিটি কোম্পানির অন্যতম প্রধান কর্মদক্ষতা সূচক হিসেবে গ্রহণ করা। বিক্রয়-পরবর্তী গ্রাহকসেবা, নিয়মিত ফলোআপ এবং ডিজিটাল রিমাইন্ডার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। একচুয়ারিয়াল সক্ষমতা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। আইডিআরএর নেতৃত্বে শিল্পব্যাপী Persistency Benchmark চালু করা এবং গ্রাহকদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি। প্রতিটি জীবন বীমা কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে Policy Persistency Rate প্রকাশের ব্যবস্থা করা, যাতে গ্রাহক, বিনিয়োগকারী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রকৃত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করতে পারেন।
বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন পলিসি বিক্রি নয়; মানুষের আস্থা পুনর্গঠন। একটি ল্যাপস হওয়া পলিসি শুধু ভবিষ্যৎ প্রিমিয়াম আয়ের ক্ষতি নয়, এটি একটি পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার দুর্বলতা এবং পুরো শিল্পের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষয়ের প্রতীক।
তাই এখন সময় এসেছে সাফল্যের সংজ্ঞা বদলানোর। নতুন কতটি পলিসি বিক্রি হলো, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতটি পলিসি দীর্ঘমেয়াদে সচল থাকল এবং কতটি পরিবার শেষ পর্যন্ত আর্থিক সুরক্ষা পেল।
জীবন বীমার প্রকৃত সাফল্য নতুন পলিসির সংখ্যায় নয়; বরং কতটি পরিবার দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সুরক্ষার ছাতার নিচে টিকে থাকল, তার মধ্যেই নিহিত। সেই কারণেই পলিসি বিক্রির পাশাপাশি পলিসি সচল রাখাকে এখন শিল্পের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। আস্থা, সুশাসন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনাই পারে বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্পকে একটি টেকসই ও শক্তিশালী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে।
Leave a Reply