নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড (হোটেল লা মেরিডিয়ান) দুর্নীতির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ভুয়া কাগজপত্র ও কৃত্রিম আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক ও পুঁজিবাজার থেকেই আত্মসাৎ করেছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী আমিন আহমেদ ইতোমধ্যে অর্থপাচারের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেস্ট হোল্ডিংসের প্রতারণা ছিল বহুস্তরীয় ও সুপরিকল্পিত।
প্রতিষ্ঠানটি জমির ভুয়া দলিল তৈরি করে সম্পদ বাড়িয়ে দেখিয়েছে, বিনিয়োগ কাঠামোর নামে কাগুজে প্রকল্প দেখিয়েছে, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে মুনাফা ও সম্পদের হিসাব ফুলিয়ে দেখিয়েছে এবং কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের বিপদে ফেলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আত্মসাৎ করা অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, স্বার্থান্ধ পুঁজিবাদের (ক্রোনি ক্যাপিটালিজম) চরম উদাহরণ হলো বেস্ট হোল্ডিংস। অশুভ যোগসাজশে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবকিছুকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট করতে পারে, সেটিই এখানে স্পষ্ট হয়েছে।
বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এই লুটপাটের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন সাবেক সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ব্যাংক চেয়ারম্যান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ সদস্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু কর্মকর্তা।
তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, বিএসইসির কিছু কর্মকর্তা বড় অঙ্কের সুবিধা নিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নতুন কমিশন গঠনের পর এই তদন্ত শুরু হয়। তবে খোন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন রহস্যজনকভাবে রিপোর্টটি ১০ মাস ধরে প্রকাশ না করে আটকে রেখেছে।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, “শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থাহীনতা। সুশাসনের অভাবে এ ধরনের অপরাধ ঘটছে। অপরাধীরা শাস্তি না পেলে বিনিয়োগকারীরা কখনোই বাজারে ফিরবে না।”
বেস্ট হোল্ডিংসের কোম্পানি সেক্রেটারি একেএ আজাদ লিপন বলেন, “তদন্ত রিপোর্টটি অত্যন্ত গোপনীয়। আমরা শুনেছি রিপোর্ট জমা পড়েছে, তবে এর বিস্তারিত জানি না। যেহেতু বিষয়টি বিচারাধীন, তাই কোনো মন্তব্য করছি না।”
বিএসইসি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেস্ট হোল্ডিংস লোকসানি প্রতিষ্ঠান হয়েও কাগজে-কলমে মুনাফা দেখিয়েছে। কোম্পানির এক জমির মূল্য দেখানো হয় ৪,০৮১ কোটি টাকা, অথচ সেই জমির মালিকানা তাদের নামে নেই।
এই ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ব্যাংক ও আইসিবি। এই পাঁচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ১,৯৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।
এর মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংকের ক্ষতিই ৪২৩ কোটি টাকা, যা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
অর্থাৎ, জনগণের আমানতের টাকা বিনিয়োগ হয়েছিল একটি অরক্ষিত, কাগুজে কাঠামোয়।
বেস্ট হোল্ডিংস ২০১৭ সালে অনিয়মের যাত্রা শুরু করে। তখন বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন ড. খায়রুল হোসেন। পরে প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর এই অনিয়ম আরও বিস্তৃত হয়।
খায়রুল কমিশন আইন লঙ্ঘন করে মাত্র ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মূলধনের কোম্পানিকে ১,২০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার অনুমতি দেয়। ১০ টাকার শেয়ার বিক্রি করা হয় ৬৫ টাকায়, যেখানে তদন্তে দেখা গেছে প্রকৃত মূল্য সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা হওয়ার কথা।
এই প্রক্রিয়ায় রেস ম্যানেজমেন্ট, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, অগ্রণী ব্যাংক ও ১০টি মিউচুয়াল ফান্ড যুক্ত ছিল—যেখান থেকে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।
তদন্তে দেখা গেছে, বেস্ট হোল্ডিংস ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তহবিল স্থানান্তর, ভুয়া বিনিয়োগ এবং জটিল লেনদেন কাঠামো তৈরি করে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
কমিটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় দুদকের মাধ্যমে পৃথক তদন্ত ও স্বাধীন ফরেনসিক অডিট করার সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে আইডিএলসি ফিন্যান্সের সংশ্লিষ্টতারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, রেস ম্যানেজমেন্টের এমডি ড. হাসান তাহের ইমাম এবং রেটিং এজেন্সির চেয়ারম্যান ড. জামালউদ্দিন আহমেদ একই আর্থিক চক্রে যুক্ত ছিলেন।
একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) তৈরি করেন।
জনতা ব্যাংক থেকেও জামালউদ্দিনের অনুমোদনে বেস্ট হোল্ডিংস ৫০০ কোটি টাকার ইক্যুইটি বিনিয়োগ পায়, যেখানে ১০ টাকার শেয়ার কেনা হয় ৬৫ টাকায়।
তদন্ত কমিটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ ও এমডি হাসান আহমেদকে ১০ কোটি টাকা করে জরিমানা, রেস ম্যানেজমেন্টের নিবন্ধন বাতিল ও ২৫ কোটি টাকা জরিমানা, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ড. হাসান তাহের ইমামকে আজীবন পুঁজিবাজার ও মুদ্রাবাজার থেকে নিষিদ্ধ, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াতসহ কমিশনারদের আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, আইসিবি ও বিজিআইসিকে আর্থিক জরিমানা, ১০টি মিউচুয়াল ফান্ডের নিবন্ধন বাতিল এবং নিরীক্ষা ও রেটিং এজেন্সিগুলোর নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিতের সুপারিশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেস্ট হোল্ডিংস কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সুশাসন সংকটের নগ্ন প্রতিচ্ছবি। তাদের ভাষায়, “এই ধরনের জালিয়াতির বিচার না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আর কখনোই ফিরে আসবে না।” সূত্র: যুগান্তর
Leave a Reply