নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বল ও তারল্য সংকটে থাকা পাঁচটি বেসরকারি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের আশ্বাস থাকলেও শেয়ারহোল্ডার বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।এ অবস্থায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চারটি প্রস্তাব জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাঠানো ওই চিঠিতে বিএসইসি বলেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক সংকটের জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দায়ী নন। অথচ ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, একীভূতকরণের পর তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেন না। নতুন ব্যাংকটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও পুরোনো পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা তাদের মালিকানা হারাবেন।
চিঠিতে বিএসইসি একীভূতকরণের সময় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য চারটি প্রস্তাব দেয়—
১. ব্যাংকের সম্পদের পাশাপাশি তাদের ব্র্যান্ড, শাখা, গ্রাহকভিত্তি ও মানবসম্পদ মূল্যায়ন করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নির্ধারণ।
২. ঋণের বিপরীতে থাকা জামানত ও দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি ক্রোক করে আদায়যোগ্য অর্থের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীদের মূল্য নির্ধারণ।
৩. দায়ী উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বাদে অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের ন্যূনতম স্বার্থমূল্য বিবেচনা করে একীভূত অনুপাত নির্ধারণ।
৪. এই মূল্য নির্ধারণ ও ঘোষণা না করা পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর শেয়ার তালিকাচ্যুত না করা।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের প্রতি অন্যায্য। তাদের যুক্তি, ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের, ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের নয়। সুতরাং আমানতকারীদের মতো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও রাষ্ট্রের বিবেচনায় থাকা উচিত।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে শরিয়াভিত্তিক এই পাঁচ ব্যাংক গভীর সংকটে পড়ে। ঋণ খেলাপি বাড়তে থাকায় অনেক আমানতকারী টাকা ফেরত পাননি। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ৯ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি অনুমোদন পায়।
এদিকে নতুন ব্যাংকের সম্ভাব্য নাম ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’ বা ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার—অর্ধেক নগদ, বাকি অংশ সুকুক বন্ডের মাধ্যমে। প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের শেয়ার দিয়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনে রূপান্তর করা হবে বেইল-ইন প্রক্রিয়ায়।
প্রাথমিকভাবে নতুন ব্যাংকটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন হলেও ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতে মালিকানা হস্তান্তর করা হবে। ব্যাংক একীভূত হলেও কেউ চাকরি হারাবেন না এবং কোনো আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
একীভূতকরণ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে। এরমধ্যে এক্সিম ব্যাংকে মো. শওকত উল আলম, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে মুহাম্মদ বদিউল আলম দিদা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে মো. সালাহ উদ্দীন, ইউনিয়ন ব্যাংকে মোহাম্মদ আবুল হাসেম এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে মকসুদুল আলম দায়িত্ব নেবেন। প্রত্যেক প্রশাসকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও চারজন করে কর্মকর্তা কাজ করবেন।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী তারা যা পাওয়ার অধিকারী, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলো একীভূত করা দরকার ছিল। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের রক্ষায় হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। তবুও সংকট কাটেনি। তবে নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) যদি পজিটিভ থাকে, তাহলে শেয়ারহোল্ডাররা কিছু পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। নেতিবাচক হলে নয়। তবুও সরকার চাইলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করতে পারে।
এদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৮ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার রয়েছে।
Leave a Reply