1. baiozidkhan@gmail.com : admin_bizp :
ঋণের বোঝা ও ভুল বিনিয়োগে গভীর সংকটে আইসিবি - Business Protidin
শিরোনাম :
প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফের উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত দেশে সরকারি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের’ কার্যক্রম শুরু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক’ গঠনের উদ্যাগ সরকারের পঞ্চমবারের মতো সাউথ এশিয়ান বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড অর্জন সোনালী লাইফের বেতন কমছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ কর্মীদের ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি হতে লাগবে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা লাভেলো আইসক্রিমের এমডির পরিবারসহ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠান টিকে থাকা ও সফলতার মৌলিক ভিত্তি: আমির খসরু দারিদ্র্যসীমার নিচে যাওয়ার ঝুঁকিতে দেশের ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ: বিশ্বব্যাংক ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি

ঋণের বোঝা ও ভুল বিনিয়োগে গভীর সংকটে আইসিবি

  • সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (আইসিবি)। বছরের পর বছর লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলেও এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়ে টিকে থাকার লড়াই করছে। অতিরিক্ত ঋণ, অতি মূল্যায়িত শেয়ারে বিনিয়োগ এবং পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুরবস্থা প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে ফেলেছে।

জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি রেকর্ড ১,২১৪ কোটি টাকা লোকসান দেখিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে প্রতিষ্ঠানটির ফান্ড ইরোশন হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অতীতে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ভেস্টেড গ্রুপের স্বার্থে উচ্চমূল্যে শেয়ার কেনা হয়েছে। বাজারের গ্যাম্বলাররা ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কৌশলে আইসিবিকে ব্যবহার করেছে।”

এদিকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে গিয়ে আইসিবি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার সীমাও অতিক্রম করে। পরে সোনালী ব্যাংকের চিঠির পর শেয়ার বিক্রি করে ৩৭৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়।

আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নীরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, “বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন বৃদ্ধি, পোর্টফোলিওতে ইরোশন এবং উচ্চসুদের ঋণের বোঝা প্রতিষ্ঠানকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিয়েছে।” তার ভাষ্য, প্রতি মাসে শুধুমাত্র সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয় প্রায় ৯০ কোটি টাকা।

আইসিবির ভেতরের অনেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ। পোর্টফোলিও বিভাগের কিছু কর্মকর্তা বাজার কারসাজিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে উচ্চমূল্যে শেয়ার ক্রয় করিয়েছেন, যা ফান্ড ইরোশন আরও বাড়িয়েছে।

লোকসানের উদাহরণ হিসেবে দেশীয় ওষুধ কোম্পানি রেনেটার শেয়ার ক্রয় উল্লেখ করা হয়। রেনাটার শেয়ার কিনতে আইসিবির বিনিয়োগ ছিল ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৮০ টাকা মূল্যেও কিছু শেয়ার কেনা হয়েছিল। বর্তমানে সেই শেয়ারের মূল্য ৩৮৯ টাকা। এ হিসাবে রেনাটার শেয়ারে বিনিয়োগে আইসিবির লোকসান ৫২১ কোটি টাকা।

আরেকটি উদাহরণ ইফাদ অটোস। ২০১৪ সালে ইফাদ অটোসের প্রতিটি শেয়ার গড়ে ৯৫.০৭ টাকা করে মোট ২৬৫.২৮ কোটি টাকায় কিনেছিল আইসিবি। ধারাবাহিক পতনে ১৩ নভেম্বর শেয়ারের মূল্য নেমে দাঁড়িয়েছে ১৯.২০ টাকা। এতে আইসিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২১১ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির পোর্টফোলিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফান্ড ইরোশনের বড় অংশই ঘটেছে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কেনা শেয়ারে। পরবর্তীতে আরও শেয়ার কিনে গড় মূল্য কমানো হলেও লোকসান কমেনি। কারণ, ধারাবাহিক পতনের কারণে পুঁজিবাজারও নিম্নমুখী হয়েছে।

এ তো গেল সেকেন্ডারি মার্কেটের কথা। প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার এফডিআরও ফেরত পাচ্ছে না আইসিবি। একটি ব্যাংক ও ১০টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৯২০ কোটি টাকা এফডিআর করেছিল আইসিবি, যা সুদসহ ছাড়িয়ে গেছে ১ হাজার কোটি টাকা। মেয়াদ শেষে এসব টাকা ফেরত পাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা করা আইসিবি এখন ডুবছে…

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ৯ বছর গড়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা করে নিট মুনাফা করেছে আইসিবি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ৪১৬ কোটি টাকা, পরের বছর তা ৮৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬০ কোটি টাকায়।

এরপর ছয় বছর (২০২৩-২৪ পর্যন্ত) গড়ে নিট মুনাফা নেমে আসে মাত্র ৮১ কোটি টাকায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট লোকসান দাঁড়ায় ১,২১৫ কোটি টাকা।

নীরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, “বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন বৃদ্ধি, পোর্টফোলিওতে ইরোশন ও উচ্চহারে নেওয়া ঋণের সুদ ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই লোকসান হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারকে সহায়তা দিতে প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছিল। পুঁজিবাজারে গতি না থাকায় অনেক শেয়ার লোকসানে রয়েছে, ক্যাপিটাল গেইন কমেছে এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকেও কম লভ্যাংশ পাওয়া যাচ্ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের কাছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, সবার আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া উচ্চসুদের ঋণ পরিশোধ করা জরুরি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩০ জুন শেষে আইসিবির মোট ঋণ ছিল ৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এক বছরে তা ২ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২০১ কোটি টাকায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ আরও প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

আইসিবির এক কর্মকর্তা বলেন, “ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করায় সুদের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। দুর্বল শেয়ার কেনায় পোর্টফোলিওতে লোকসান হয়। ফলে আয় কমেছে, টাকাও ফেরত দিতে পারছি না। ওই সময় পোর্টফোলিও বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা বাজারের গ্যাম্বলারদের সঙ্গে আইসিবিকে শেয়ারের ‘পার্কিং স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহার করেন।”

আয়ের ৯৪ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধে: গত আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের উপস্থিতিতে এক প্রেজেন্টেশনে বলা হয়—বর্তমানে আইসিবির মোট আয়ের প্রায় ৯৪ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।

প্রেজেন্টেশন অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত মোট দায় দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার ২৭ কোটি টাকা এবং এসব ঋণের ওপর বকেয়া সুদ ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩ কোটি টাকা।

এই ঋণের মধ্যে রয়েছে মেয়াদি আমানত ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৩ হাজার কোটি টাকা, সাব-অর্ডিনেটেড বন্ডের ১ হাজার ১৯ কোটি টাকা, পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিলের ৮০৭ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি আমানত হিসেবে নেওয়া ১৫ কোটি টাকা।

ঋণ করে বিনিয়োগ করে বড় সংকটে পড়া আইসিবিকে বাঁচাতে সরকার থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছে। প্রেজেন্টেশনে আরও উল্লেখ করা হয়, এক দশক আগে সুদ পরিশোধে আইসিবির ব্যয় ছিল ৫০ শতাংশেরও কম।

ইতোমধ্যে আইসিবি রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা উচ্চসুদের ঋণ পরিশোধে এবং ১ হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ব্যবহার হয়েছে। এই ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৫০ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে বলে আইসিবির দাবি।

অভিযোগের তীর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে: আইসিবির কর্মকর্তারা বলেন, তৎকালীন পর্ষদ ও পোর্টফোলিও বিভাগের কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ এবং পোর্টফোলিওতে বড় ইরোশন হওয়াই আইসিবির সংকটের মূল কারণ।

২০১৬ ও ২০১৭ সালে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ইফতেখার উজ জামান। এ বিষয়ে জানতে তার ফোন নম্বরে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) ছিলেন হাবীবুর রহমান।

আইসিবির অভ্যন্তরীণ এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাবীবুর রহমানের সময়ে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার শেয়ার কেনা হয়েছিল। বর্তমানে ওই শেয়ারের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ফান্ড ইরোশন হয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

বর্তমানে হাবীবুর রহমান পদোন্নতি পেয়ে জেনারেল ম্যানেজার (হিসাব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, সে সময়ের বিনিয়োগগুলো কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করা হয়েছিল। পুঁজিবাজারে গতি না থাকায় দাম কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, “আইসিবি লোকসানে শেয়ার বিক্রি করতে পারে না। তাই মূল্য কমে যাওয়ার পরও শেয়ারগুলো বিক্রি করা হয়নি।” সূত্র: টিবিএস

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের সোশ্যাল মিডিয়া আইকনে ক্লিক করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2025 Businessprotidin.com
Site Customized By NewsTech.Com