নিজস্ব প্রতিবেদক: উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত চাপে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারেও। ব্যাংকঋণের সুদহার ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে ওঠায় নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কমেছে। এতে উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটে থাকা শেয়ারবাজারে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ মনে করেন, উচ্চ সুদের হার এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা। তাঁর মতে, এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে লাভ করা কঠিন। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আবু আহমেদ বলেন, শুধু নীতিগত সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। বরং ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি নীতিগত সুদের হার অন্তত ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, সুদের হার কমলে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়তে পারে, উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহও স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
শেয়ারবাজারের আস্থার সংকট কাটাতে মানসম্মত ও স্থিতিশীল বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং লাভজনক সরকারি প্রকল্পগুলোর বন্ড বা শেয়ার বাজারে আনা যেতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সিকিউরিটিজের জোগান বাড়বে এবং সরকারও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।
সরকারের অধীনে থাকা অলাভজনক ও বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অর্থনীতির জন্য বোঝা হিসেবে উল্লেখ করেন আবু আহমেদ। এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত বেসরকারি খাতে হস্তান্তর অথবা শেয়ারবাজারে অফলোড করে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে তিনি মত দিয়েছেন। এতে সরকারি লোকসান কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থনীতির দুর্বল প্রবৃদ্ধিও শেয়ারবাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আবু আহমেদের হিসাবে, বর্তমানে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ৩ শতাংশের ঘরে। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। তাই বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
ব্যবসার খরচ কমাতে বন্দর ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় গতি আনার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস ও ছাড়ে দীর্ঘ সময় লাগায় আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বাড়ছে। তাঁর মতে, সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি ছাড়া শুধু আর্থিক বাজারে সংস্কার করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ।
Leave a Reply