1. baiozidkhan@gmail.com : admin_bizp :
ডিজিটাল যুগে ব্যাংকাস্যুরেন্স কেন গুরুত্বপূর্ণ? - Business Protidin

ডিজিটাল যুগে ব্যাংকাস্যুরেন্স কেন গুরুত্বপূর্ণ?

  • সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬

আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের: অনেকের কাছেই ব্যাংকাস্যুরেন্সকে একটি বীমাপণ্য বলে মনে হয়। বাস্তবে এটি কোনো আলাদা বীমাপণ্য নয়; বরং বীমাপণ্য বাজারজাত করার একটি কার্যকর ও আধুনিক পদ্ধতি। এই ব্যবস্থায় ব্যাংক তার বিদ্যমান অবকাঠামো ও গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবহার করে বীমা কোম্পানির পণ্য বিতরণ করে। বিশ্বের বহু দেশে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংকাস্যুরেন্স একটি সফল মডেল হিসেবে প্রচলিত, যা ব্যাংক ও বীমা—উভয় খাতের জন্যই লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে।

সহজভাবে বিষয়টি বোঝা যায় দৈনন্দিন ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থেকে। আমরা ব্যাংকে টাকা জমা রাখি, কিন্তু লেনদেনের জন্য সব সময় শাখায় যেতে হয় না—ডিজিটাল মাধ্যমেই তা সম্ভব। একইভাবে, আগে যেখানে বীমা করতে আলাদা করে বীমা কোম্পানির খোঁজ করতে হতো, ব্যাংকাস্যুরেন্সের ফলে এখন পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকেই বীমা সেবা পাওয়া যায়। এতে গ্রাহকের আস্থা বাড়ে, কারণ ব্যাংকের সঙ্গে তার একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সম্পর্ক আগে থেকেই গড়ে ওঠে।

বীমা কোম্পানির জন্যও ব্যাংকাস্যুরেন্স কার্যকর। আলাদা বিক্রয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বিপুল জনবল ও ব্যয় প্রয়োজন হয়। ব্যাংকের বিদ্যমান শাখা ও গ্রাহকভিত্তি ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে বীমাপণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হয়। ফলে বীমা সেবার বিস্তার যেমন বাড়ে, তেমনি বাজারজাতকরণের দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়।

ব্যাংকাস্যুরেন্স কার্যকর হওয়ার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক রয়েছে। এসব গ্রাহক নিয়মিত লেনদেন, ঋণ গ্রহণ, এলসি খোলা বা অন্যান্য সেবার জন্য ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এই নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে একটি শক্তিশালী আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। সাধারণত গ্রাহকের ব্যাংকের প্রতি আস্থা যতটা, বীমা কোম্পানির প্রতি তা তুলনামূলকভাবে কম। ব্যাংকাস্যুরেন্স এই আস্থাকেই বীমা সেবার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। পাশাপাশি ‘শপিং আন্ডার ওয়ান রুফ’ ধারণার মাধ্যমে গ্রাহক এক জায়গায় একাধিক আর্থিক সেবা পেয়ে যান।

ডিজিটাল যুগে ব্যাংক ও বীমা খাতের অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য হলো একীভূত আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, একটি মাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই গ্রাহক তার ব্যাংকিং ও বীমা–সংক্রান্ত প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তার এবং স্মার্টফোননির্ভর সেবার জনপ্রিয়তা এই মডেলকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

তবে ব্যাংকাস্যুরেন্স বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যাংক ও বীমা খাতের পৃথক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো কার্যকরভাবে সমন্বয় করা না গেলে গ্রাহক অভিজ্ঞতা ব্যাহত হতে পারে। তাই সফল ব্যাংকাস্যুরেন্স মডেলে ডিজিটাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিয়ন্ত্রক শর্তগুলো এমনভাবে যুক্ত করা জরুরি, যাতে গ্রাহক অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় না পড়েন এবং একই সঙ্গে নীতিমালার পূর্ণ অনুসরণ নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা ও ডেটা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা গ্রাহক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ব্যাংকাস্যুরেন্সের টেকসই সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে অংশীদারিত্বের গুণগত মানের ওপর। যেসব ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান কেবল স্বল্পমেয়াদি বিক্রয় লক্ষ্যে কাজ করে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক সন্তুষ্টি ধরে রাখা কঠিন হয়। বিপরীতে, অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, সাংগঠনিক সামঞ্জস্য এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অংশীদারিত্ব সেবা মান উন্নত করে এবং গ্রাহক ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ায়। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান বাজারে এই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকাস্যুরেন্সের সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো গ্রাহক অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের অনেক গ্রাহক এখনও বীমাকে জটিল, সময়সাপেক্ষ ও আস্থাহীন সেবা হিসেবে দেখেন। ব্যাংকের পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বীমা সেবা সহজভাবে উপস্থাপন করা গেলে এই ধারণা বদলানো সম্ভব। ব্যাংকিং অ্যাপের মধ্যেই বীমা পলিসি ব্যবস্থাপনা ও দাবি নিষ্পত্তির সুবিধা যুক্ত হলে স্বচ্ছতা ও ব্যবহারযোগ্যতা দুটোই বাড়ে।

ডেটা ও বিশ্লেষণ সক্ষমতাও ব্যাংকাস্যুরেন্সকে আরও কার্যকর করতে পারে। ব্যাংকের বিদ্যমান গ্রাহক তথ্য বীমা প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহকের আর্থিক আচরণ ও ঝুঁকিপ্রবণতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তিকৃত ও প্রয়োজনভিত্তিক বীমা সমাধান তৈরি করা সম্ভব, যা গ্রাহকের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ডিজিটাল চ্যানেল ও কল সেন্টারের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকাতেও বীমা সেবার পরিধি বাড়ানো যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকাস্যুরেন্স আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রান্তিক গ্রাহক ও নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সেগমেন্টের কাছে উপযোগী বীমা সমাধান ব্যাংকের বিদ্যমান সম্পর্কের মাধ্যমেই সহজে পৌঁছানো সম্ভব। এতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থিতিশীলতা আসে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও বীমা খাতের ডিজিটাল সংযুক্তি একটি সমন্বিত আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলে।

বাংলাদেশের ব্যাংকাস্যুরেন্স খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর, নিয়ন্ত্রক সচেতনতা ও গ্রাহকের পরিবর্তিত প্রত্যাশা এই মডেলকে এগিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গ্রাহককে কেন্দ্রে রেখে পারস্পরিক আস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ব্যাংকাস্যুরেন্স দেশের আর্থিক খাতের রূপান্তরে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভূমিকা রাখতে পারবে।

বর্তমান সময়ে ব্যাংকাস্যুরেন্সে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করা কয়েকটি বীমা কোম্পানির মধ্যে রয়েছে গার্ডিয়ান লাইফ। কোম্পানিটি তাদের সাফল্য ধরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকাসুরেন্স মার্কেট বিস্তারেও তাদের নানান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের সোশ্যাল মিডিয়া আইকনে ক্লিক করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2025 Businessprotidin.com
Site Customized By NewsTech.Com