নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারকে শুধু শেয়ারনির্ভর কাঠামো থেকে বের করে আনতে এবার কমোডিটি ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর উদ্যোগ জোরদার করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে নতুন পণ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নির্ধারণের আধুনিক কাঠামো গড়ে তুলতে কমোডিটি ডেরিভেটিভ হতে পারে নতুন দিগন্ত। তবে প্রযুক্তি, আইন, ব্রোকার প্রস্তুতি ও নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে বহুবার পিছিয়েছে এই উদ্যোগ।
রোববার (১০ মে) সিএমজেএফ অডিটোরিয়ামে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস’ ফোরাম (সিএমজেএফ) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “কমোডিটি এক্সচেঞ্জ: সম্ভাবনা, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ” শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এক্সচেঞ্জের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার ফারজানা লালারুখ বলেন, “আমরা ক্যাপিটাল মার্কেটকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বাস্তবে আমরা কতটুকু প্রস্তুত, সেটাও আমাদের বুঝতে হবে। সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই আমরা সামনে এগোতে চাই।”
তিনি জানান, ২০২৫ সালে সিএসই’র কমোডিটি ডেরিভেটিভস প্রবিধান কমিশন সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক পর্যায়ের কাজ প্রায় শেষ। এখন এক্সচেঞ্জের প্রস্তুতি, পণ্য নির্বাচন ও অপারেশনাল সক্ষমতা নিশ্চিত হলেই পরবর্তী ধাপে যাওয়া হবে।
বিএসইসি কমিশনার বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে—ইকুইটি, বন্ড ও কমোডিটি। কিন্তু বাংলাদেশের বাজার দীর্ঘদিন ধরে মূলত ইকুইটিনির্ভর রয়ে গেছে।
কমোডিটি ডেরিভেটিভ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বা গুজব এড়াতে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, “আপনাদের কলম অনেক শক্তিশালী। কমোডিটি নিয়ে এমনভাবে লিখবেন যেন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে। বেসিক থেকে ব্যাখ্যা করতে হবে।”
তার ভাষায়, “বন্ড মার্কেটে কিছু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। এখন আমরা চাই ডেরিভেটিভ মার্কেটও বিকশিত হোক।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, ডেরিভেটিভ মার্কেটের দুটি বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘প্রাইস ডিসকভারি’ ও ‘হেজিং’। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ দামের ধারণা তৈরি এবং মূল্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা। কৃষিপণ্যনির্ভর অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সিএসই চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান জানান, কমোডিটি ডেরিভেটিভস সেগমেন্ট চালুর জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে এটি পুরোপুরি অপারেশনাল করতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, “২০২৩ সাল থেকে আমরা এটার প্রস্তুতি নিচ্ছি। গত বছর চালুর আশা ছিল, কিন্তু সম্ভব হয়নি। আমরা আশা করছি চলতি বছরের মধ্যেই সেগমেন্টটি অপারেশনাল করা যাবে।”
সিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, দেশের শেয়ারবাজার এখনও মূলত একটি “সিম্পল ইকুইটি মার্কেট” হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে। উন্নত বাজারের মতো ডেরিভেটিভস বা কমোডিটি পণ্য যুক্ত করতে গেলে প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের এক্সচেঞ্জ প্রযুক্তি এখনও বহুলাংশে বিদেশি নির্ভর। উন্নত ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, সার্ভার, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আমদানিনির্ভর হওয়ায় সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। “আমরা দেড় বছর আগেই প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে বসে আছি। কিন্তু আইনগত ও সমন্বয়গত কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে এগোতে পারিনি,” বলেন তিনি।
সিএসই এমডি স্বীকার করেন, বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়েছে। তার মতে, “নতুন বাজার তৈরি করতে গেলে রেগুলেটর, এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, সরকার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো নতুন প্রোডাক্ট সফল করা সম্ভব না।”
তিনি আরও বলেন, কমোডিটি মার্কেট চালুর জন্য নতুন ধরনের ব্রোকার, অথরাইজড ট্রেডার এবং পৃথক আইনগত কাঠামো প্রয়োজন হচ্ছে। সেই প্রস্তুতির কাজ এখনও চলছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরুতে তুলনামূলক সহজ কিছু পণ্যে ক্যাশ সেটেলড ফিউচারস ট্রেড চালু করা হবে। পরবর্তীতে চাল, গমসহ প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতা, কম তারল্য ও সীমিত পণ্যের সংকটে ভুগছে। সে বাস্তবতায় কমোডিটি ডেরিভেটিভস নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সফল হতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ অংশগ্রহণকারী এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কর্মশালাটি সিএমজেএফ এর সেক্রেটারি আহসান হাবীবের উপস্থানায় সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেন।
Leave a Reply