বিশেষ প্রতিনিধি: দেশের বীমা খাতে সংকট দীর্ঘদিনের। কিছুদিন পূর্বেও বর্তমান আইডিআরএ চেয়ারম্যান কাজের অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে কম আয় বাঁধা বলে জানিয়েছেন। তবে বিগত সময়ের চেয়ে আয় কম হলেও অনেক বেশি ব্যয় হয়েছে তার সময়ে তবুও নেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি। অথচ ক্রমেই বাড়ছে বীমা খাতের অভিযোগ। বিশেষ করে গ্রাহকের পাওনা বীমা দাবি পরিশোধে নেই কোন কার্যকরী পদক্ষেপ।
জানা যায়, বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ২০১২-২০১৮ সাল পর্যন্ত আট বছরে গড়ে প্রায় ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করেছে। ২০১৮-২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে এ আয় কমে গড়ে ১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইডিআরের প্রস্তাবিত আয় ছিল ৩৭ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা এবং ব্যয় ৩৭ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি ছিল।
এদিকে ২০১২ সালে ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা’ করে আইডিআরএ। বিমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়নের জন্য প্রতি ১ হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে শতকরা শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ হারে ৩ টাকা ৫০ পয়সা ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১২-২০১৭ সাল পর্যন্ত আট বছরে গড়ে প্রায় ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করেছে।
২০১৮ সালে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী তৎকালীন বিআইএ চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের চাপে ‘পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দোহাই দিয়ে’ নিবন্ধন ফি কমিয়ে শতকরা ১০ পয়সা বা হাজারে ১ টাকা করা হয়। ফলে ২০১৮-২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে এ আয় কমে গড়ে ১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় নেমে আসে। এতে আয় কমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইডিআরের প্রস্তাবিত আয় ছিল ৩৭ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা এবং ব্যয় ৩৭ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা।
এ হিসাবে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি ছিল। ফলে ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’ সংশোধন করে নিবন্ধন ফি প্রস্তাব আনা হয়েছে। যাতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ব্যয় সামাল দেওয়ার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি আইডিআরএ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত বিধিমালার খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত আহ্বান করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী জানা গেছে, বর্তমানে বিমা কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধন নবায়ন ফি দিতে হয় গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের ওপর প্রতি হাজারে এক টাকা, যা খসড়া প্রজ্ঞাপনে পাঁচ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে খসড়া প্রজ্ঞাপন অনুসারে বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়বে হাজারে চার টাকা। এর আগে ২০১২ সালে ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’-এ নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজারে গৃহীত গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে সাড়ে ৩ টাকা নির্ধারণ করা ছিল। পরে ২০১৮ সালে এই নিবন্ধন নবায়ন ফি ভারতের সঙ্গে তুলনাক্রমে কমিয়ে এক টাকা নির্ধারণ করা হয়।
আইডিআরএ বলছে, ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারতের মোট গ্রস প্রিমিয়াম প্রায় ৬ লাখ কোটি রুপি এবং বাংলাদেশের মোট গ্রস প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ১৮ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। ভারতে নিবন্ধন নবায়ন ফি কম হলেও গ্রস প্রিমিয়াম আয় বেশি হওয়ায় ইন্সুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়ার বার্ষিক আয় ৬০০ কোটি রুপি এবং এতে দেশটির ব্যয়ভার সংকুলান সম্ভব। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর্তৃপক্ষের আয়ও তুলনামূলক অনেক কম।
তথ্যমতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতেই নিবন্ধন ফি পাঁচ টাকা করতে চায় আইডিআর, যা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩ দশমিক ৫০ টাকা ছিল। ৮২টি বিমা কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর অনুমোদনকৃত মোট ১৫৫ জনবলের মধ্যে ১০২ জন কর্মরত আছেন, যেখানে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ৭ হাজার জনবল নিয়ে ৬৩টি ব্যাংক দেখভাল করছে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, নিবন্ধন নবায়ন ফি বর্তমানে এক টাকা হিসাবে কর্তৃপক্ষের ব্যয় কোনো রকমে নির্বাহ করা হচ্ছে, কিন্তু কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষের এই ব্যয় চার গুণ বা তারও বেশি বাড়বে। কারণ কর্তৃপক্ষ বিমাকারীদের আইআইএমএসের সেবা বিনা মূল্যে দেওয়া, জনবল বাড়ানো, জনবলের পেনশন-গ্র্যাচুইটি, নিজস্ব ভবন নির্মাণ, শাখা কার্যালয় স্থাপন, বিমাশিল্পে পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বিসিআইআই, বিআইআইএম, অ্যাকচুয়ারিয়াল সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বর্ধিত টাকার প্রয়োজন।
এ ছাড়া সংস্থাটি বিমা খাতের মানোন্নয়নে বাংলাদেশ চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্স্যুরেন্স ম্যানেজম্যান্ট, অ্যাকচুরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। আর এসব ব্যয় মেটাতেই আইডিআরএ সময়োপযোগী ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করছে। এসব কার্যক্রম করতে কর্তৃপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে নিবন্ধন নবায়ন ফি এক টাকার স্থলে পাঁচ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান বলেন, আস্থার সংকট বিমা খাতের প্রধান সমস্যা। দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাবে এটি তৈরি হয়েছে। রাতারাতি এটা থেকে উত্তরণ করা যাবে না। এর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য আইনগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। বিগত সময়ে আইডিআরএ যথাযথভাবে বিমা কোম্পানিগুলোকে তদারকি বা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। কারণ বিমা আইন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ক্ষমতায়িত করা হয়নি। নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে জরিমানা করা ছাড়া তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। জরিমানার টাকাটাও খুব সামান্য।
দেশের বিমা খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি লাইফ বিমা কোম্পানির নিট প্রিমিয়াম আয়ের সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ খরচ করতে পারবে প্রধান কার্যালয়। এমন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে সম্প্রতি মতামত চেয়েছে আইডিআরএ। গত মাসে কর্তৃপক্ষ এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠিয়েছে। এ বিষয়ে মতামত চেয়ে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
আইডিআরএ বলছে, বিদেশি বিমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা, ২০২০’-এর প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বিমাকারীর মূল ব্যবসাস্থল বাংলাদেশের বাইরে থাকলে সে ক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়ের ব্যয় বিমাকারীর লাইফ ইনস্যুরেন্স ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট বছরের নিট প্রিমিয়াম আয়ের সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ করতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, প্রধান কার্যালয়ের এই ব্যয়ের সীমা বিধি ৩-এ নির্ধারিত ব্যয়সীমার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য হবে এবং তা কোনো অবস্থাতেই বিধি ৩-এ বর্ণিত সীমার অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হবে না।
আরও শর্ত উল্লেখ করা হয়, এই বিধিতে নির্ধারিত প্রধান কার্যালয়ের ব্যয় বিদেশে পাঠানোর আগে ব্যয়ের যৌক্তিকতাসহ পূর্ণাঙ্গ বিবরণী দাখিল করে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে লাইফ বীমার একাধিক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিজনেস প্রতিদিনকে বলেন, আইডিআরএ নিবন্ধন ফি বাড়াতে চাচ্ছে এই টাকা তো গ্রাহকের টাকা থেকে দিতে হবে। তাহলে যেখানে গ্রাহকের বীমা দাবি দিতে কোম্পানিগুলো হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া অহেতুক সিদ্ধান্ত। তাছাড়া খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিয়ে আইডিআরএ নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে চাওয়া সত্যিই অযৌক্তিক।
Leave a Reply