নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বীমা খাতে বীমা দাবির টাকা পরিশোধে কোম্পানিগুলোর অনিহা, তহবিল আত্মসাত এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দেশের লাইফ বীমা খাতে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি গ্রাহক সংখ্যায়। গত আড়াই বছরে দেশে লাইফ বীমার সক্রিয় পলিসি কমেছে ১০ লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি, যা এ খাতের জন্য ভয়ংকর অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকসংখ্যায় ১৩ শতাংশের বেশি পতন ঘটেছে।
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দেশে লাইফ বীমা খাতে চালু পলিসির সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ৯ হাজার ১২১টি। ২০২৪ সালের শেষে এই সংখ্যা নেমে আসে ৭০ লাখ ৮৯ হাজার ৭৭৭টিতে, অর্থাৎ এক বছরে কমে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৩৪৪টি। ২০২৫ সালের জুন শেষে চালু পলিসির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৭টি, অর্থাৎ চলতি বছরেই ঝরে গেছে আরও ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৬৬টি।
সব মিলিয়ে আড়াই বছরে লাইফ বীমা খাত থেকে গ্রাহক হারিয়েছে মোট ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯২৪টি পলিসি, যা শতাংশের হিসাবে ১৩.১৪ শতাংশ পতন। এই পতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বীমা দাবির টাকা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা, তহবিল সংকট এবং আস্থাহীনতা।
বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা কোম্পানিগুলোর অর্থ আত্মসাত ও অনিয়মের কারণে তহবিল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রাহকরা সময়মতো দাবি পান না এবং বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন নিজের পাওনা অর্থের জন্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বীমা গ্রাহকরা মাসের পর মাস কোম্পানির অফিসে ঘুরেও দাবি নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
আইডিআরএ’র কাছে জমা দেয়া অভিযোগের সংখ্যা গত দুই বছরেই বেড়েছে দেড়গুণের বেশি, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলোর নিষ্পত্তি বিলম্বিত হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, দেশের লাইফ বীমা খাতে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে একাধিক লাইফ বীমা কোম্পানিতে হাজার কোটি টাকার তহবিল তছরুফ হয়েছে।
শুধু তিনটি কোম্পানি- ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, সোনালী লাইফ ও হোমল্যান্ড লাইফ থেকেই আত্মসাত হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এই অনিয়মের ফলে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্ব দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে বাজারে ইসলামী ও প্রচলিত উভয় লাইফ বীমা খাতে আস্থা কমছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল ভূমিকা: নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ অভিযোগ পেয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারায় গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, আইডিআরএ’র মানবসম্পদ ও আইনগত কাঠামো শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বীমা খাতের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় গত দুই বছরেও স্থবির অবস্থায় রয়েছে। অপরদিকে নতুন পলিসি ইস্যু যেমন কমেছে তেমনি নবায়ন পলিসির হারও কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা চলতে থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যেই সক্রিয় পলিসি সংখ্যা নেমে যেতে পারে ৬৫ লাখের নিচে, যা খাতটির জন্য এক বড় অশনি সংকেত হবে।
দাবি পরিশোধে অনিয়ম, বিনিয়োগে অস্বচ্ছতা, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি- এই তিন কারণেই দেশের লাইফ বীমা খাত এক গভীর আস্থাহীনতার মুখে পড়েছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চাইলে, এখনই কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি। নইলে ‘বীমা নিরাপত্তার প্রতীক’ নয়, বরং ‘হতাশার প্রতীক’ হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাত।
Leave a Reply