মোহাম্মদ জহির উদ্দিন: জীবন বীমা কোনো সাধারণ আর্থিক পণ্য নয়; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অঙ্গীকার। উন্নত বিশ্বে জীবন বীমা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, বিনিয়োগ, পুঁজিবাজারের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশের জীবন বীমা খাত এখনও তার প্রকৃত সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। এই স্থবিরতার কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি মৌলিক সংকট—জনআস্থার ঘাটতি, সুশাসনের দুর্বলতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন (জিডিপির তুলনায় মোট বীমা প্রিমিয়ামের অনুপাত) দীর্ঘদিন ধরেই ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। একই সঙ্গে ইন্স্যুরেন্স ডেনসিটি (মাথাপিছু বীমা প্রিমিয়াম) আন্তর্জাতিক মানের তুলনায়ও অনেক কম। অর্থাৎ, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনও বীমা সুরক্ষার বাইরে। এটি স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্প এখনও কাঙ্ক্ষিত গভীরতা ও পরিধি অর্জন করতে পারেনি।
জীবন বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়—বিশ্বাস। একজন গ্রাহক আজ প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন এই আস্থায় যে প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। কিন্তু দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিক্রয়ের সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান, দুর্বল গ্রাহকসেবা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম প্রকাশ্যে এলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিল্পের ভাবমূর্তি। একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা অনেক সময় সমগ্র জীবন বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, একটি কার্যকর বীমা খাত ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসাকে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, একটি শক্তিশালী বীমা শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
বাংলাদেশের জীবন বীমা খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনবলের অভাব। আধুনিক জীবন বীমা কেবল বিক্রয়নির্ভর ব্যবসা নয়; এটি ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অ্যাকচুয়ারিয়াল বিজ্ঞান, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি, আইন, গ্রাহকসেবা এবং করপোরেট সুশাসনের সমন্বিত একটি পেশা। কিন্তু বাস্তবে প্রশিক্ষিত আন্ডাররাইটার, অ্যাকচুয়ারি, ঝুঁকি বিশ্লেষক এবং পেশাদার ব্যবস্থাপকের সংখ্যা এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যতে গ্রাহক অসন্তোষ, ভুল বিক্রয় (মিস-সেলিং) এবং আইনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
“ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্স্যুরেন্স সুপারভাইজার্স” বীমা খাতে সুশাসন, গ্রাহক সুরক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং স্বচ্ছতাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ওইসিডি দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্সকে টেকসই বীমা শিল্পের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। আইএমএফও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের মূল্যায়নে নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য যে, আইএমএফ বাংলাদেশের জীবন বীমা খাত নিয়ে পৃথক কোনো বিশদ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তাই এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত দাবি তথ্যসম্মত হবে না।
পুনর্জাগরণের রূপরেখা: বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্পকে ঘিরে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কীভাবে জনআস্থা পুনর্গঠন করা যাবে? এর উত্তর নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় নয়; বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত উন্নয়নে। এজন্য প্রয়োজন—
দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা; করপোরেট সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা; বিক্রয়কর্মী থেকে প্রধান নির্বাহী পর্যন্ত সবার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত সার্টিফিকেশন চালু করা; ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা; গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তির একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা; বীমা সচেতনতা ও আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জীবন বীমাকে কেবল কমিশননির্ভর বিক্রয় কার্যক্রম হিসেবে নয়, একটি মর্যাদাপূর্ণ আর্থিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে নেতৃত্ব গড়ে উঠলে দক্ষ জনবলও তৈরি হবে, জনআস্থাও ফিরে আসবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাড়ছে, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আর্থিক পরিকল্পনার গুরুত্বও বাড়ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় জীবন বীমা খাতের সামনে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন, দক্ষ নেতৃত্ব এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
জীবন বীমা মূলধনের ব্যবসা নয়; এটি বিশ্বাসের ব্যবসা। আর বিশ্বাস কেনা যায় না—এটি অর্জন করতে হয় সততা, দক্ষতা, জবাবদিহি এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমে। বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্প যদি এই চারটি ভিত্তির ওপর নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তবে এটি শুধু একটি সফল আর্থিক খাতই নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হবে।
লেখক: মোহাম্মদ জহির উদ্দিন
সাবেক উপ-ব্যবস্থানা পরিচালক (অপারেশন) এবং সিইও (ভারপ্রাপ্ত) প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।
Leave a Reply